বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচে দুই দলের ফুটবলারদের একমাত্র লক্ষ্য থাকবে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরা। তবে নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের এই লড়াই শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। অনেকের মতে, এই ম্যাচের ফলই নির্ধারণ করে দিতে পারে ২০২৬ সালের বিশ্বের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার ব্যালন ডি’অরের ভাগ্য।
লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দীর্ঘ আধিপত্যের যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এরপরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরস্কারটির জন্য একজন স্পষ্ট দাবিদার থাকতেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।
এবারের লড়াইয়ে একাধিক ফুটবলার রয়েছেন সমানভাবে আলোচনায়। তবে অতীতের পরিসংখ্যান বলছে, একই বছরে ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতা কিংবা বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা না জিতলে বিশ্বের সেরা হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।
ইতিহাস বলছে, গত ১৯ আসরের মধ্যে মাত্র চারবার এমন হয়েছে, যখন ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতা, বিশ্বকাপ, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা—এর কোনোটিই না জিতে কোনো ফুটবলার বিশ্বের সেরা নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনবারই পুরস্কারটি জিতেছেন মেসি এবং একবার রোনালদো।
সে কারণেই অসাধারণ গোল করার পরও হ্যারি কেইন, আরলিং হলান্ড, কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল অলিসে, ডেকলান রাইস ও জুড বেলিংহামের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করা হচ্ছে।
গত বছর ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতা জিতে বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়েছিলেন উসমান দেম্বেলে। এবারও তার দল শিরোপা ধরে রাখায় দেম্বেলে ও তার সতীর্থ খভিচা কোয়ারাৎসখেলিয়ার নামও আলোচনায় রয়েছে।
তবে সব আলোচনার কেন্দ্রে এখন বিশ্বকাপের ফাইনাল। ৩৯ বছর বয়সী মেসি রেকর্ড নবমবারের মতো বিশ্বের সেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল গতবারের রানার্সআপ অবস্থান ছাড়িয়ে এবার শীর্ষে উঠতে চান।
মেসি যেন সময়কে হার মানিয়েই খেলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া লিগে খেললেও বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, তিনি এখনো বিশ্বের সেরাদের একজন। আট গোল ও চারটি গোলে সহায়তা করে তিনি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন। সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়েও তিনি এগিয়ে আছেন, কারণ সমান আট গোল করা এমবাপ্পের চেয়ে তার একটি বেশি গোলে সহায়তা রয়েছে।
রোববার আর্জেন্টিনা জিতলে মেসিই হবেন ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক, যিনি টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করবেন।
তবে সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন লামিন ইয়ামাল।
গত ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মতো এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি আলো ছড়াতে না পারলেও স্পেনের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। সাত ম্যাচে একটি গোল করলেও দলকে ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে অবদান রেখেছেন এই তরুণ।
ক্লাব ফুটবলেও মৌসুমটি ছিল তার জন্য দারুণ। চোটে শেষ এক মাস মাঠের বাইরে থেকেও ৪৫ ম্যাচে ২৪ গোল ও ১৮টি গোলে সহায়তা করেন তিনি। তার দল ঘরোয়া লিগ জিতলেও ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়। তাই বিশ্বের সেরা হতে হলে স্পেনের বিশ্বকাপ জয় প্রায় অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে।
হ্যারি কেইনের মৌসুমও ছিল দুর্দান্ত। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করেন তিনি এবং তার দল ঘরোয়া লিগ ও কাপ—দুই শিরোপাই জেতে। কিন্তু ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল এবং বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হারের কারণে তার সম্ভাবনা কমে গেছে।
কেইন নিজেই একবার বলেছিলেন, ‘আমি যদি এক মৌসুমে ১০০ গোলও করি, তারপরও ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতা বা বিশ্বকাপ না জিতলে বিশ্বের সেরা হওয়া কঠিন। শুধু আমার নয়, সবার ক্ষেত্রেই বিষয়টি একই।’
তার সতীর্থ মাইকেল অলিসেও দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন। ৫২ ম্যাচে ২২ গোল করার পাশাপাশি ৩১টি গোলে সহায়তা করেন তিনি। বিশ্বকাপেও সর্বোচ্চ পাঁচটি গোলে সহায়তা করেছেন। তবে সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে যাওয়ায় তার সম্ভাবনাও ধাক্কা খেয়েছে।
ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবারও ধারাবাহিক ছিলেন। ঘরোয়া লিগ ও ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপেও করেছেন আট গোল। কিন্তু শিরোপাহীন মৌসুম ও বিশ্বকাপ থেকে বিদায় তার সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
আরলিং হলান্ড টানা তৃতীয়বারের মতো ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতেছেন। তবে দলীয় সাফল্য বলতে ছিল কেবল দুটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতার শিরোপা। যদিও ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ের হয়ে সাত গোল করে নিজের মর্যাদা আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন।
বর্তমান বিশ্বের সেরা ফুটবলার দেম্বেলে আবারও ঘরোয়া লিগ ও ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতা জিতেছেন। যদিও চোটের কারণে পুরো মৌসুমে নিয়মিত খেলতে পারেননি। এরপরও বিশ্বকাপে পাঁচ গোল ও দুটি গোলে সহায়তা করে তিনি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন।
তার ক্লাব সতীর্থ খভিচা কোয়ারাৎসখেলিয়া ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতায় দুর্দান্ত খেললেও তার দেশ জর্জিয়া বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। ফলে তার সম্ভাবনাও সীমিত।
ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও চোট ও শিরোপাহীন মৌসুমের কারণে জুড বেলিংহামের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
অন্যদিকে ডেকলান রাইস শীর্ষ দশে জায়গা করে নিতে পারেন। তার দল ঘরোয়া লিগ জিতেছে এবং ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতার শিরোপা থেকে মাত্র কয়েকটি টাইব্রেকারের দূরত্বে ছিল।

