শোনো প্রিয়,
মানুষ এই পৃথিবীতে প্রেম খুঁজতে আসে না শুধু—
সে আসে নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মাকে খুঁজতে।
তাই সে একেকজন মানুষের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ে।
কখনও প্রেমিকের চোখে,
কখনও বন্ধুর কণ্ঠে,
কখনও সন্তানের হাসিতে,
কখনও কোনো পবিত্র মানুষের ছায়ায়
সে নিজের ভাঙা আত্মার প্রতিধ্বনি শুনতে চায়।
মানুষ ভাবে,
“কেউ আমাকে পূর্ণ করবে।”
কিন্তু আত্মার আকাশে
কেউ কারও অপূর্ণতা পূর্ণ করতে জন্মায় না।
প্রত্যেক মানুষই নিজের ভিতরে
এক বিশাল মরুভূমি বহন করে।
সেখানে দিনের পর দিন
অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্নের বালুঝড় ওঠে।
সেখানে শৈশবের মৃত কান্নারা
রাতের বুকে একা একা ঘুরে বেড়ায়।
সেখানে এমন এক নীরবতা আছে,
যেখানে পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসাও পৌঁছাতে পারে না।
আর মানুষ সেই নীরবতাকে ভয় পায়।
তাই সে সম্পর্ক বানায়।
অধিকার বানায়।
প্রতিশ্রুতি বানায়।
শপথ বানায়।
ধর্ম বানায়।
এমনকি ঈশ্বরের মুখও কল্পনা করে—
শুধু যেন একা না থাকতে হয়।
কিন্তু প্রিয়,
তুমি কি জানো—
আত্মার সবচেয়ে পবিত্র দরজা খুলে যায়
ঠিক সেই মুহূর্তে,
যখন মানুষ বুঝতে পারে
তার ভিতরের শূন্যতাকে কেউ পূর্ণ করতে আসবে না।
সেই উপলব্ধি প্রথমে আগুনের মতো পোড়ায়।
কারণ তখন সমস্ত মুখোশ খুলে পড়ে।
তখন তুমি বুঝতে পারো—
যাদের তুমি ভালোবেসেছিলে,
তাদের অনেককেই তুমি ভালোবাসোনি;
তুমি শুধু তাদের ভিতরে আশ্রয় খুঁজেছিলে।
তুমি তাদের ব্যবহার করেছিলে
নিজের একাকীত্বকে নীরব করার জন্য।
এই সত্য খুব নির্মম।
কিন্তু এই নির্মম সত্যের ভিতরেই
মুক্তির প্রথম আলো জন্মায়।
কারণ যেদিন তুমি নিজের নিঃসঙ্গতার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে—
“এসো, আমি আর তোমার থেকে পালাব না,”
সেদিন তোমার আত্মা প্রথম নিঃশ্বাস নেবে।
তারপর ভালোবাসা বদলে যাবে।
তখন তুমি কাউকে শৃঙ্খল পরাতে চাইবে না।
কাউকে নিজের ব্যক্তিগত ঈশ্বর বানাতে চাইবে না।
কাউকে আঁকড়ে ধরে বলতে চাইবে না—
“তুমি না থাকলে আমি বাঁচব না।”
না প্রিয়,
তখন তুমি শুধু বলবে—
“তুমি এসেছিলে, তাই আমার আকাশে কিছু আলো নেমেছিল।
তুমি চলে গেলেও সেই আলোর সৌন্দর্য মিথ্যা হবে না।”
এটাই পরিণত আত্মার প্রেম।
যেখানে অধিকার নেই,
ভয় নেই,
হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক নেই।
সেখানে দুইটি আত্মা
দুইটি নদীর মতো কিছুদূর পাশাপাশি বয়ে যায়,
তারপর আবার নিজের নিজের সমুদ্রে ফিরে যায়।
আর যে মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে,
সে পৃথিবীর কাছে আর ভিক্ষা চায় না।
সে জানে—
কেউ তাকে রক্ষা করতে আসবে না।
আর সেই কারণেই
সে ভয়ের ওপারে পৌঁছে যায়।
প্রিয়,
মানুষের সবচেয়ে বড় মুক্তি
কাউকে পেয়ে নয়—
নিজের আত্মার নীরবতাকে গ্রহণ করার মধ্যে।
কারণ যে আত্মা নিজের অন্ধকারকে আলিঙ্গন করতে শিখেছে,
তার কাছে ভালোবাসা আর ক্ষুধা নয়—
ভালোবাসা হয়ে ওঠে প্রার্থনা।
আর তখন পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক
কারাগার থেকে ফুলের বাগানে রূপ নেয়।
সেখানে মানুষ মানুষকে অধিকার করে না—
শুধু একটু আলো ভাগ করে নেয়,
একটু নীরবতা বোঝে,
একটু হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনে।
তারপর একদিন
সন্ধ্যার পাখির মতো
প্রত্যেকে ফিরে যায়
নিজের অসীম আকাশের দিকে।
——————————-
— সৈয়দ এল. আলী বাহরাম
প্রাক্তন সদস্যঃ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ॥

