সত্য সমাচার ডিজিটাল:
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রায় এক যুগ পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়ছে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত স্বস্তির হলেও এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো শ্রমবাজারে। কারণ সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় ও সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য নতুন করে আলোচনায় আসবে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে বেতন পুনর্নির্ধারণের দাবি আরও জোরালো হতে পারে। এ অবস্থায় উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, রপ্তানি বাজারে দুর্বলতা এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিল্প-কারখানার জন্য বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি নতুন করে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ফলে সরকারি পে-স্কেলের পর বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো হবে অনেকটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।
এদিকে সোমবার নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পর এ বেসরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, বেসরকারি শিল্প ও অন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়েও মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। শিল্প মালিকদের দৃষ্টিতে ‘একই পে-স্কেল’ নয়— বেসরকারি খাতের জন্য সরকারি পে-স্কেলের হুবহু অনুসরণ সম্ভব নয়, এমন অবস্থানই আপাতত স্পষ্ট উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিতে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদেরও প্রত্যাশার জায়গা তৈরি হয়েছে। মালিকরা যদি বেতন বৃদ্ধি করেন তাহলে তো অনেক ভালো। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করলে তাদের জন্য অনেক কঠিন হবে। সরকারি বেতন বৃদ্ধির ফলে নতুন সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। পরিবহন থেকে শুরু করে সব পণ্যের দাম বাড়বে। তাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষ মিলে একটি যৌক্তিক সমাধানে যেতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি কর্মীদের মধ্যেও বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিক দাবি ওঠা স্বাভাবিক। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে তাদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার মানও কমেছে। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন পর্যালোচনা প্রয়োজন। তবে সব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। একবারে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, তৈরি পোশাক এবং শ্রমঘন শিল্পে উৎপাদন-ব্যয় বাড়াতে পারে। এমনকি কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও খাতভিত্তিক বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয় করা উচিত। নিম্ন আয়ের কর্মীদের অগ্রাধিকার, মূল্যস্ফীতিভিত্তিক ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে বাজার তদারকি, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
এফবিসিসিআই প্রশাসক ও উদ্যোক্তা ফজলুল হক গণমাধ্যমকে জানান, সরকারি পে-স্কেল অনুমোদনের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাৎক্ষণিকভাবে একই হারে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে না। তিনি বলেন, সরকারি বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতও বর্তমানে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে বড় কারখানা ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া, রপ্তানি বাজারে সংকট এবং জ্বালানি সমস্যার মতো বিষয়গুলো উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে কর্মীদের বেতন বাড়ানোর চেয়ে প্রতিষ্ঠান চালু রাখাই এখন বড় বিষয়। তবে একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন সমন্বয়ের দাবিকে যৌক্তিক বলেও মন্তব্য করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকারের অস্বাভাবিক বেতন বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। পাশাপাশি সর্বত্রই মজুরি বৃদ্ধির দাবি উঠবে। কিন্তু বেতন বাড়ানোর অবস্থা শিল্প মালিকদের আছে কিনা সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, চলমান সংকটের সময়ে বেতন বৃদ্ধি কোনোভাবেই সম্ভব না। শিল্প-কারখানায় নানা রোগে বাসা বেঁধেছে। এই রোগ না সারলে শিল্প-কারখানা একের পর এক বন্ধ হতে থাকবে।
এদিকে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, পোশাক শিল্পের অবস্থা এখন ভয়াবহ খারাপ। কর্মীদের নিয়মিত বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। নিয়মিত বেতন দিতে না পারায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত বন্ধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শিল্প-কারখানা বাঁচিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি বেতন বৃদ্ধি নতুন করে শিল্প-কারখানায় চাপ বাড়াবে।
এদিকে শ্রমিক নেতা মোশরেফা মিশু বলেন, শ্রমিকদের বেতন ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। নইলে শিগগিরই শ্রমিকরা কঠোর আন্দোলনে যাবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি বেতন বৃদ্ধির ফলে সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে। তাতে শ্রমিকরা বড় বিপদে পড়বে। তাদের সংসার চালানো কঠিন হবে।
উদ্যোক্তারা বাস্তব সংকটে : বেসরকারি খাতের বাস্তবতা সরকারি খাতের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। একটি সরকারি পে-স্কেল কার্যকর করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে অর্থের সংস্থান করতে হয়। কিন্তু একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কর্মীর বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, বিদ্যুৎ-গ্যাস, ঋণের সুদ, কাঁচামালের দাম, কর, রপ্তানি বাজার এবং পণ্যের চাহিদার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, রপ্তানি বাজারের দুর্বলতা এবং অর্থায়নের ব্যয় অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বেতন বৃদ্ধির সক্ষমতা সীমিত করছে।
সরকারি পে-স্কেল নিয়ে আলোচনায় অর্থনীতিবিদদের একটি বড় যুক্তি হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় তাদের প্রকৃত আয় কমে গিয়েছিল। একই যুক্তি বেসরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর ইনক্রিমেন্ট থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানে তা একই হারে বা নিয়মিতভাবে হয় না।
বেসরকারি কর্মীদের জন্য আলাদা কাঠামোর দাবি : বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, সরকারি পে-স্কেল বেসরকারি খাতে হুবহু প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই; বরং বেসরকারি কর্মীদের জন্য শিল্প ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ন্যূনতম বেতন কাঠামো থাকা দরকার।
ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি তুলেছে। গার্মেন্টস শ্রমিক নেতারা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিও জানিয়েছেন।
অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের বক্তব্য হচ্ছে— মজুরি বাড়াতে হলে শিল্পের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ, ব্যাংকঋণের সুদ, করব্যবস্থা, আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা— এসব ক্ষেত্রে স্বস্তি না এলে হঠাৎ বড় ধরনের মজুরি বৃদ্ধি অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এখানে সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত এবং ব্যাংকঋণের ব্যয় কমানো গেলে উদ্যোক্তাদের পক্ষে কর্মীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো সহজ হবে।
একই সঙ্গে সরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধির কারণে বাজারে যেন কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম না বাড়ে, সে বিষয়েও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে। এফবিসিসিআই নতুন পে-স্কেলকে অজুহাত করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানো বা অতিরিক্ত মুনাফা না করার আহ্বান জানিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বেসরকারি খাতে আয় সমন্বয় না হলে সরকারি ও বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে আয়বৈষম্য আরও দৃশ্যমান হতে পারে। আবার অতিরিক্ত বেতন ব্যয় সামলাতে না পারলে কিছু শিল্পে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগও চাপে পড়তে পারে। তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু ‘বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে কিনা’ নয়, বরং প্রশ্ন হলো— কীভাবে এমন একটি মজুরি কাঠামো তৈরি করা যায়, যেন কর্মীরা মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পান, আবার শিল্প মালিকরাও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে পারেন।

