ধর্ম ডেস্ক
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষ নিজের সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ কিংবা জীবনের কোনো সাফল্য দেখে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত বা মুগ্ধ হতে পারে। কিন্তু তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে অন্য কারও দৃষ্টি ছাড়াই নিজের কোনো নেয়ামত দেখে মুগ্ধ হওয়ার কারণে কি নিজেরই বদনজর লাগতে পারে? ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি এ বিষয়ে কী বলে?
ইসলামে বদনজরের অস্তিত্ব স্বীকৃত। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বদনজরের ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেছেন এবং জানিয়েছেন, নজরের প্রভাব বাস্তব। (ইবনে মাজাহ: ৩৫০৮)
নিজের নেয়ামত দেখে মুগ্ধ হলে করণীয়
নিজের সৌন্দর্য, সন্তান, অর্থ-সম্পদ কিংবা অন্য কোনো ভালো কিছু দেখে ভালো লাগা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। এতে দোষ নেই। তবে এমন পরিস্থিতিতে নেয়ামতের প্রকৃত মালিক যে আল্লাহ এ কথা মনে রেখে তার শুকরিয়া আদায় করা উচিত। একই সঙ্গে ওই নেয়ামতের জন্য বরকত কামনা করাও উত্তম।
এ বিষয়ে সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর একটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একবার আমের ইবনে রবীআ (রা.) সাহল (রা.)-কে গোসল করতে দেখে তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই সাহল (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে জানানো হলে তিনি বলেন, কারও ভাইয়ের এমন কোনো বিষয় ভালো লাগলে, যা তাকে মুগ্ধ করে, তার জন্য যেন সে বরকতের দোয়া করে। এরপর আমের (রা.)-কে অজু করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সেই পানি সাহল (রা.)-এর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়। (ইবনে মাজাহ: ৩৫০৮; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৫৫০)
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, কারও কোনো সৌন্দর্য বা ভালো বিষয় দেখে মুগ্ধ হলে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। তবে এটিকে এমন সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয় যে, মানুষ নিজের চোখের দৃষ্টিতেই নিশ্চিতভাবে নিজের ওপর বদনজর লাগিয়ে ফেলে। বরং নিজের কোনো নেয়ামত দেখে আনন্দিত হলে আল্লাহর প্রশংসা করা, শুকরিয়া আদায় করা এবং বরকতের জন্য দোয়া করা উত্তম আমল।
মুগ্ধ হলে কী দোয়া করা যায়?
নিজের কিংবা অন্যের কোনো নেয়ামত দেখে ভালো লাগলে তার জন্য বরকত কামনা করা যেতে পারে। যেমন বলা যায়-اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ
অর্থ: হে আল্লাহ, এতে আমার জন্য বরকত দান করুন।
তবে এই বাক্যটিকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নির্দিষ্ট শেখানো দোয়া হিসেবে দাবি করার প্রয়োজন নেই। মূল বিষয় হলো, কোনো ভালো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে তার জন্য আল্লাহর কাছে বরকত চাওয়া। চাইলে নিজের ভাষাতেও সেই দোয়া করা যায়।
বদনজরের প্রভাব দেখা দিলে কী করবেন?
কোনো ব্যক্তির ওপর বদনজরের প্রভাব পড়েছে বলে মনে হলে শরিয়তসম্মত রুকইয়া করা যেতে পারে। হাদিসে এমন একটি রুকইয়ার দোয়া বর্ণিত হয়েছে, যেখানে ক্ষতিকর বিষয়, মানুষের অনিষ্ট এবং হিংসুকের দৃষ্টির ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও সুস্থতা চাওয়া হয়।
بِاسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরকিক, মিন কুল্লি শাইইন ইউ’যিক, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনি হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফিক।
অর্থ: আল্লাহর নামে তোমার জন্য রুকইয়া করছি। যা কিছু তোমাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক প্রাণীর অনিষ্ট এবং হিংসুকের নজরের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দান করুন। (সহিহ মুসলিম: ২১৮৬)
বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া, দোয়া করা এবং শরিয়তসম্মত রুকইয়া করা যেতে পারে।
প্রতিটি বিপদকে বদনজর মনে করা ঠিক নয়
ইসলামে বদনজর সত্য এ বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে, জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, ব্যর্থতা কিংবা বিপদের কারণ হিসেবে বদনজরকে ধরে নিতে হবে। কোনো সমস্যার পেছনে যদি স্বাভাবিক বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যাযোগ্য কারণ থাকে, তাহলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শুধু বদনজরের আশঙ্কায় চিকিৎসা বা বাস্তব কারণ অনুসন্ধান বাদ দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, কাউকে সন্দেহ করা, অকারণে ভয় পাওয়া কিংবা কুসংস্কারের আশ্রয় নেওয়াও ইসলামের শিক্ষা নয়। তাবিজ-কবজ বা ভিত্তিহীন কোনো পদ্ধতির পরিবর্তে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, দোয়া এবং শরিয়তসম্মত রুকইয়ার ওপর নির্ভর করাই উত্তম।
নেয়ামত পেলে একজন মুসলিমের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
সৌন্দর্য, সন্তান, অর্থ-সম্পদ কিংবা কোনো সাফল্য অর্জন করে আনন্দিত হওয়া স্বাভাবিক এবং তা নিজে কোনো অপরাধ নয়। তবে এসব নেয়ামত যে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, সেই উপলব্ধি থাকা জরুরি।
নিজের কোনো ভালো বিষয় দেখে মুগ্ধ হলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং বরকতের জন্য দোয়া করা ভালো। একইভাবে অন্যের সৌন্দর্য, সন্তান, সম্পদ বা সাফল্য দেখে ভালো লাগলেও তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। এতে একদিকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হয়, অন্যদিকে হিংসা ও ক্ষতিকর দৃষ্টির মতো নেতিবাচক বিষয় থেকেও নিজেকে দূরে রাখা যায়।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম: ২১৮৬, ২১৮৭; ইবনে মাজাহ: ৩৫০৮, ৩৫০৯; মুসনাদে আহমাদ: ১৫৫৫০।

