স্বেচ্ছায় হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে আটকে রাখার অভিযোগে করা মামলায় তাদের অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাই কোর্ট। একইসঙ্গে বেআইনিভাবে আটকে রাখার জন্য দুই বোনের মা-বাবা ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ এই রায় দেন। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পছন্দের কারণে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যায় না।
আদালত পুলিশ ও প্রশাসনকেও সতর্ক করে বলেছেন, মুক্তির পর ওই দুই নারীর ব্যক্তিগত জীবন, সিদ্ধান্ত বা পছন্দের বিষয়ে যেন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা না হয়।
দুই বোনকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরিবারের কাছে আটকে রাখার অভিযোগে দায়ের করা একটি হেবিয়াস কর্পাস রিট আবেদনের শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত আসে। রায়ে ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত ৩১ জুলাই মামলাটির আগের শুনানিতে হাই কোর্ট পুলিশকে দুই বোনকে সশরীরে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিল। ওই শুনানিতে আদালত পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে এবং নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করলে, প্ররোচনা, বলপ্রয়োগ বা প্রতারণার প্রমাণ না থাকায় সেই সিদ্ধান্ত তার মৌলিক অধিকারের অংশ। এ ক্ষেত্রে বাবা বা অন্য কোনো ব্যক্তির সেই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অধিকার নেই।
মামলার নথি অনুযায়ী, ৩৫ ও ২০ বছর বয়সী দুই বোন ২০২০ ও ২০২১ সালে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বিষয়টি জানার পর তাদের বাবা তাদের বাড়িতে আটকে রাখেন এবং নথিপত্র ও পাসপোর্ট নিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বছর কোনোভাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে দুই বোন কলকাতায় চলে গেলে তাদের বাবা অপহরণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে মামলা করেন। পরে আগ্রা পুলিশ কলকাতা থেকে তাদের উদ্ধার করে বাবার হেফাজতে দেয়।
এরপর আদালতে দুই বোন অভিযোগ করেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কারণে তাদের বাবা তাদের আটকে রেখেছিলেন এবং পুনরায় হিন্দুধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
দুই বোনের পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ কাইফ হাসান বলেন, এই রায় আবারও প্রমাণ করল যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বাধীনতা তার পরিবারের ধর্মীয় পছন্দের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দুই নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের নিজস্ব মত, বিশ্বাস ও ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকারকে মৌলিক স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এলাহাবাদ হাই কোর্টের এই রায় সেই আইনি অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

