সত্য সমাচার ডিজিটাল:
২৬ জুলাই ২০২৬
আজ ২৬ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘তিন সমন্বয়ক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। তাদের কারা যেন হুমকি দিয়েছিল। নিরাপত্তার জন্য তাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’ যদিও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়ককে তুলে নেওয়া এবং চলমান আন্দোলনে এদিন পর্যন্ত বিএনপির ৩৫ কেন্দ্রীয় নেতাসহ সারাদেশের তিন হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ অবস্থায় দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকার পতনের এক দফা দাবিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয় বিএনপি। এদিন বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘এ আন্দোলন এখনও টিকে আছে শুধু দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একক চেষ্টায়।’
২৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে বিক্ষোভ, সংঘাত, ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে ‘ব¬ক রেইড’ দিয়ে চলে গ্রেপ্তার। ব্যাপক অভিযানের মাঝেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^রচন্দ্র রায়, যুগ্ম মহাসচিব আবদুস সালাম আজাদ, সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, চেয়ারপারসনের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা সামসুদ্দিন দিদার ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের শীর্ষ নেতা শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ নানা মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাদের সবারই অনুরোধ ছিল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লেখার জন্য।
১৭ জুলাই থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৬ হাজার ২৬৪ জন গ্রেপ্তার হয়। এর মধ্যে গত ২৫ জুলাই রাত থেকে ২৬ জুলাই দুপুর পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয় ৭৬৫ জনকে। এর মধ্যে রাজধানীতে গ্রেপ্তার করা হয় ২০৭ জনকে। রাজধানীতে ১০ দিনে গ্রেপ্তার করা হয় ২ হাজার ৪১৬ জন। এদিন ঢাকার বাইরে নতুন ২২টি ও ঢাকায় আরও ৮টি মামলা হয়। ঢাকায় এ নিয়ে মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৯টি। এদিনও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আন্দোলনকারীদের একজন মারা যান। এ নিয়ে ১৬ জুলাই থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী ২০৯ জন নিহত হয় আন্দোলনে।
এদিন কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২৬ জুলাই সকালে রংপুরের পীরগঞ্জে গিয়ে তার মা-বাবার হাতে সাড়ে সাত লাখ টাকার একটি চেক তুলে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দল।
এ ছাড়া বাংলাদেশে তৎকালে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি গুলি ব্যবহারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকটির ‘শহীদ রুদ্র তোরণ’ নামকরণ করেন কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ২৬ জুলাই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
এদিন বিকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সহিংসতায় আহতদের দেখতে গিয়ে দলমত নির্বিশেষে আহত সবার চিকিৎসা ও আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দেন। এর আগে, সকালে রামপুরায় নাশকতাকারীদের হামলা ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন পরিদর্শন করেন শেখ হাসিনা।
২৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সে দেশের লেবার পার্টির এমপি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ড. রুপা হক বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে পার্লামেন্টে প্রশ্ন তুলেন। তিনি বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান জানতে চান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে প্রাণহানি ও ধ্বংস নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার রাজনৈতিক সমধানের দাবি জানায় বামপন্থি জোট ও দলগুলো।
সরকারি চাকরিতে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে রাজধানীসহ সারাদেশে সহিংসতায় প্রাণহানি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশের জনগণ যে সহিংসতার শিকার হয়েছে তাতে বিস্ময় প্রকাশ করে কানাডা।
এদিন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানায়, ভিন্নমত ও দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অপরাধ নয়, সাংবিধানিক অধিকার। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতা চলাকালে প্রত্যেকটি প্রাণহানির ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। একই সঙ্গে ঢালাওভাবে মামলা, গ্রেপ্তার বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।

