লন্ডন প্রতিনিধি
পাসপোর্ট আর ভিসার সীমানা পেরিয়ে লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় হেঁটে গেলে হুট করেই মনে হতে পারে—এ তো অন্য এক ঢাকা কিংবা সিলেট! রাস্তার নামফলক থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড—সবখানেই জ্বলজ্বল করছে পরিচিত বাংলা হরফ।
যে স্পিটালফিল্ডস আর ব্রিক লেনের অলিগলিতে আজ বাংলা ভাষার দাপ্তরিক জয়জয়কার, তার পেছনে রয়েছে চার দশকের এক নীরব সংগ্রামের গল্প। আর সেই সংগ্রামের অন্যতম সারথী প্রবীণ সমাজসেবক ও সংগঠক মোহাম্মদ আব্দুল রহিম (এম এ রহিম, সিআইপি)।
লন্ডনে বাংলা ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও দৃশ্যমান রূপ দেওয়া এবং প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মাঝে মাতৃভাষার বীজ বুনে দিতে তাঁর অবদান অনবদ্য। তবে আফসোসের বিষয়, চার দশক ধরে বিলেতের মাটিতে বাংলা ভাষার এই আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রাখলেও জাতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি—একুশে পদক—এখনো পাননি এই ভাষানুরাগী।
গুণীজনেরা বলছেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে তাঁর যে ঐতিহাসিক অবদান, তাতে বহু আগেই তাঁর হাতে রাষ্ট্রীয় এই সম্মাননা ওঠা উচিত ছিল।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় এম এ রহিম বাংলা ভাষাকে প্রবাসের প্রশাসনিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম শুরু করেন।
তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও জোরালো পদক্ষেপে স্পিটালফিল্ডস এলাকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলা টাউন’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ব্রিক লেনসহ পূর্ব লন্ডনের প্রধান প্রধান সড়কগুলোর সাইনবোর্ডে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার ঐতিহাসিক কাজের পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
শিক্ষা অঙ্গনেও তাঁর অবদান কম নয়।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের শিক্ষা কমিটির ভাইস চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্থানীয় স্কুল ও দাপ্তরিক কাজে বিপুলসংখ্যক দ্বিভাষিক (Bilingual) শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের সুযোগ তৈরি করেন। এতে করে বিলেতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাঙালি শিশুদের মাতৃভাষা চর্চার পথ সুগম হয়। টাওয়ার হ্যামলেটস কলেজের প্রতিষ্ঠাতা গভর্নর হওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সেন্ট পিটার্স সাপ্লিমেন্টারি স্কুল’, ‘বাইলিঙ্গুয়াল পেরেন্টস অ্যান্ড গভর্নর সেন্টার’সহ একাধিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
বিলেতের পাশাপাশি জন্মভূমির অবহেলিত মানুষের জন্যও কাজ করে যাচ্ছেন এম এ রহিম।
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘আলহাজ্ব মো. মোখলেসুর রহমান ডিগ্রি কলেজ’, যেখানে শত শত শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থনীতি ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে টানা ১১ বার অনাবাসী সিআইপি (NRB CIP) খেতাবে ভূষিত করেছে।
প্রবাসের মাটিতে যারা জীবন বাজি রেখে বাংলা ভাষার পতাকা উঁচিয়ে ধরেছেন, তাঁদেরকে যথাসময়ে মূল্যায়ন করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। এম এ রহিম কেবল একজন সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির এক নিঃস্বার্থ কাণ্ডারি।
ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাঁর চার দশকের এই অবদান বিবেচনা করে তাঁকে ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হলে তা কেবল একজন গুণী মানুষকে সম্মান জানানো হবে না, বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা নিয়ে সংগ্রাম করা প্রতিটি বাঙালির ত্যাগকেই সম্মানিত করা হবে।

