শহুরে ব্যস্ত জীবনে চোখের শুষ্কতা বা ‘ড্রাই আইজ’ এখন বেশ পরিচিত সমস্যা। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, অনিয়মিত জীবনযাপনসহ নানা কারণে চোখে অস্বস্তি তৈরি হয়। সাধারণত চোখের প্রদাহ কমানো এবং কৃত্রিম অশ্রু বা লুব্রিক্যান্ট ব্যবহারের মাধ্যমে এর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে রোগটির মূল কারণ পুরোপুরি দূর করার কার্যকর চিকিৎসা এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে আসেনি।
অন্যদিকে, আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঘুমের সমস্যাও। কারও ঘুম আসতে দেরি হচ্ছে, কেউ পর্যাপ্ত সময় ঘুমাতে পারছেন না, আবার অনেকের ঘুম হলেও তার মান ভালো হচ্ছে না। এসব সমস্যার কারণে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঝিমুনি, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সম্প্রতি ‘বিএমসি চক্ষুবিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল’প্রকাশিত একটি চীনা গবেষণায় চোখের শুষ্কতা ও ঘুমের সমস্যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। গবেষকদের দাবি, যাদের ড্রাই আইজের সমস্যা রয়েছে, তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি।
বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের পরিচালিত এই বিশ্লেষণে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ২১টি গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ১৯ হাজার ২১৮ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য নিয়ে করা হয় এই মেটা-অ্যানালিসিস। গবেষণার প্রধান লেই টিয়ানের নেতৃত্বাধীন দল দেখতে পায়, ড্রাই আইজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঘুমের সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে অনিদ্রা, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা কম ঘুম, ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়া এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব। ঘুমের গুণগত মান মূল্যায়নের জন্য গবেষণায় ‘পিটসবার্গ ঘুমের মান নির্ণায়ক সূচক’-এর মতো সূচকও ব্যবহার করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় ড্রাই আইজে আক্রান্তদের ঘুমের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১.৭৮ গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে নাক ডাকা এবং অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যার উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে ঘুমের সময় শরীরে, বিশেষ করে মস্তিষ্কে, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। গবেষকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ড্রাই আইজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুম না আসার ঝুঁকি প্রায় ২.২০ গুণ বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কটি একমুখী নয়। অর্থাৎ শুধু ড্রাই আইজের কারণে ঘুমের সমস্যা হয় এমন নয়; দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যাও চোখ শুষ্ক হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আই সার্জেন জ্যোতির্ময় চাকীর মতে, ঘুমের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যেই ড্রাই আইজের উপসর্গ দেখা যায়। তার হিসাবে, এমন রোগীদের প্রায় ৪০ শতাংশের চোখ শুষ্কতার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
এর আগেও সৌদি আরবের রিয়াধের ইমাম মহম্মদ ইবন সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল স্কুলের গবেষকেরা ঘুমের মানের সঙ্গে চোখের শুষ্কতার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল, ঘুমের গুণমান খারাপ হলে ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড থেকে অশ্রু নিঃসরণের পরিমাণ কমতে পারে। এর ফলে চোখে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় না থাকায় ড্রাই আইজের সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
ওই গবেষণায় ২৩৪ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে ৭১.৪ শতাংশের মধ্যে গুরুতর ড্রাই আইজ, ১৫ শতাংশের ক্ষেত্রে মাঝারি মাত্রার এবং ১৩.৭ শতাংশের মধ্যে মৃদু ড্রাই আইজের উপসর্গ পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে নতুন গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, চোখের সুস্থতা এবং পর্যাপ্ত ঘুম দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। ঘুমের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে যেমন চোখের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, তেমনি ড্রাই আইজের অস্বস্তিও ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

