সবুজ শক্তিতে রূপান্তর বাধাগ্রস্ত করতে জীবাশ্ম জ্বালানি সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো মরিয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করেন পেত্রো। তিনি বলেন, ‘জ্বালানির এ প্রাচীন রূপ—জীবাশ্ম জ্বালানি—যা কিনা মৃত্যুর কারণ, তার ক্ষমতা ও অর্থনীতির মধ্যে একটি জড়তা কাজ করছে। নিঃসন্দেহে পুঁজিবাদের এ রূপ নিজে আত্মঘাতী হওয়ার পাশাপাশি মানবজাতি ও অন্যান্য প্রাণসত্তাকেও ধ্বংস করতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, পুঁজিবাদ কি আদৌ জীবাশ্ম জ্বালানিবিহীন কোনো মডেলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে?’
সাবেক অর্থনীতিবিদ ও গেরিলা যোদ্ধা পেত্রো ২০২২ সালে কলম্বিয়ার প্রথম বামপন্থি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী টানা দ্বিতীয়বার নির্বাচনে লড়ার সুযোগ না থাকায় আগামী মাসে নতুন নেতা নির্বাচনে ভোট দেবেন কলম্বিয়ার নাগরিকরা। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বর্বরতার দিকে ধাবিত হচ্ছি। আর এ বর্বরতা হলো ফ্যাসিবাদেরই পূর্বাভাস।
কলম্বিয়ার উপকূলীয় শহর সান্তা মার্তায় জীবাশ্ম জ্বালানি ত্যাগের বিষয়ে বিশ্বের প্রথম এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মঙ্গলবার থেকে সরকার ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুদিন ব্যাপী আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে চার দিন ধরে নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
ইতোমধ্যেই কিছু দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের রূপরেখা তৈরি শুরু করেছে। কলম্বিয়া গত সপ্তাহে তাদের খসড়া পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে মঙ্গলবার প্রথম উন্নত দেশ হিসেবে ফ্রান্স তাদের জাতীয় রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে। যেখানে ২০২৭ সালের মধ্যে কয়লা, ২০৪৫ সালের মধ্যে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম গ্যাস পুরোপুরি বন্ধের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের জলবায়ু দূত বেনোয়া ফারাকো বলেন, প্যারিস চুক্তির তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা আরও জোরালো। কয়েক দশক ধরে ফ্রান্সের বিদ্যুতের বড় অংশ পারমাণবিক শক্তি থেকে এলেও এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হবে। ফারাকো বলেন, আমরা ইউরোপের ‘ইলেকট্রিক সৌদি আরব’ হতে চাই, যারা যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও জার্মানির মতো দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ (গ্রিন ইলেকট্রন) বিক্রি করবে।
সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থায়ন বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, ঋণ সংকট মোকাবিলা না করে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। ‘ফসিল ফুয়েল ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা জেপোরা বারম্যান বলেন, গ্লোবাল সাউথের (উন্নয়নশীল দেশ) অনেক দেশ কেবল ঋণের বোঝা শোধ করতেই জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে কেবল আফ্রিকাতেই ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
কলম্বিয়ার সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সুসানা মুহম্মদ বলেন, যেসব দেশ ঋণের সুদ দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তাদের পক্ষে জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানি না করে ওষুধ বা সারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সম্মেলনে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অনুন্নত দেশগুলোর ঋণ মওকুফেরও দাবি জানান।
যদিও এ সম্মেলন থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সরাসরি কোনো বড় অংকের অর্থ সহায়তার ঘোষণা আসার সম্ভাবনা কম, তবে জীবাশ্ম জ্বালানিতে দেওয়া বছরে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি কীভাবে পরিবেশবান্ধব খাতে সরিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক সংস্কারের পথ দেখাচ্ছে এ সান্তা মার্তা সম্মেলন।