সত্য সমাচার ডেস্ক:
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকার গণপরিবহনে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এটিকে একমাত্র পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। বিপুল ব্যয়ে একের পর এক মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের বিপরীতে বাস, বিআরটি, কমিউটার রেল ও পথচারীবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন পিছিয়ে রয়েছে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবে মেট্রোরেল-১ ও মেট্রোরেল-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে বলে দাবি করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। এতে বৈদেশিক ঋণের চাপ আরও বাড়বে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গতকাল শুক্রবার ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক অনলাইন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। আইপিডি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের আগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, প্রকল্পের উপযোগিতা ও লাভ-ক্ষতির যথাযথ বিশ্লেষণ এবং বিকল্প গণপরিবহনব্যবস্থার সম্ভাবনা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ঢাকাকে ‘মেট্রোরেলের ফাঁদে’ ফেলেছে। ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও এসব খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি; বরং সংশোধিত এসটিপিতে তিনটি মেট্রোরেলের প্রায় ৬০ কিলোমিটারের প্রস্তাব থেকে ছয়টি মেট্রোরেলের ১৪০ কিলোমিটারের বেশি নেটওয়ার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইপিডির তথ্য অনুযায়ী, এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। জাইকার অর্থায়নে এমআরটি-১-এ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৩ হাজার ৬৬১ কোটি এবং এমআরটি-৫ (উত্তর)-এ ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ব্যয়ের এই পার্থক্য প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।
বক্তারা বলেন, কমলাপুর-এয়ারপোর্ট-জয়দেবপুর রেলপথে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন চালুর সুযোগ রয়েছে। অথচ বিদ্যমান রেলপথের কার্যকর ব্যবহার না করে এর সমান্তরালে বিপুল ব্যয়ে পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে। কুড়িল-পূর্বাচলে তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে বাস রুট রেশনালাইজেশন, উন্নত বাস সার্ভিস, বিআরটি, এলআরটি ও কমিউটার রেলের মতো বিকল্প ব্যবস্থার পরিবর্তে মেট্রোরেলকেন্দ্রিক পরিকল্পনা পরিবহন ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, মেট্রোর পাশাপাশি বাস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে প্রায় ১ শতাংশ ট্রিপ মেট্রোর মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। ভবিষ্যতে সব মেট্রো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হলেও তা সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ট্রিপ বহন করতে পারবে। ফলে বাকি যাত্রীর জন্য কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। আইপিডির পক্ষ থেকে প্রকল্পের ব্যয় স্বাধীনভাবে যাচাই; ২০ থেকে ৩০ বছরের জীবনচক্র ব্যয় প্রকাশ; দরপত্র ও চুক্তির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ এবং প্রতিটি নতুন পরিবহন প্রকল্পে বিআরটি, এলআরটি ও কমিউটার রেলের মতো বিকল্পের স্বাধীন লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

