অনলাইন ডেস্ক
১৬ এপ্রিল ২০২৬
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দামের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব এবং আমদানি ব্যয়ের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এর বিপরীতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম থাকায় বিপুল অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে বহন করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকারও বেশি; যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এ বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের চিন্তা করছে সরকার। পাইকারি ও খুচরাÑ দুই পর্যায়েই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় উঠেছে। তবে তাৎক্ষণিক অনুমোদন না দিয়ে বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরলে এ কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে ভর্তুকি কমানো, মূল্য সহনীয় রাখা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নির্দেশনা আসতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেল, এলএনজি দাম যত বাড়ছে, অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে চলেছে। সরকার বিশাল পরিমাণ আর্থিক ভর্তুকির হাত থেকে রক্ষা
পেতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। যদিও ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বিদ্যুৎ ও জ¦ালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছিলেন, সরকার অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে থাকতে চায়; তবে সামগ্রিক আর্থিক দুরবস্থার কথা চিন্তা করে সরকার এখন বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায়। ইতোমধ্যে চলতি মাসের ১ তারিখে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ দাম বাড়াতে বিদ্যুৎমন্ত্রীর অনুমোদনসাপেক্ষে মন্ত্রিসভা বৈঠকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সেই প্রস্তাব ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আরও পর্যালোচনা করে কীভাবে ভর্তুকি বেশি পরিমাণে কমিয়ে আনা যায়, সেই বিষয়ে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
গত ৯ এপ্রিল জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটির কার্যপ্রণালির মধ্যে রয়েছে মূলত বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম সমন্বয়ের বিষয়ে কাজ করবেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ অবস্থায় পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্র্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করবে কমিটি। পর্যালোচনা শেষে তারা মন্ত্রিসভার বৈঠকের জন্য সুস্পষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। কমিটিতে প্রয়োজনে অতিরিক্ত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং বিদ্যুৎ বিভাগ এ কমিটির প্রশাসনিক সহায়তা দেবে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি করেন অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ইরানযুদ্ধের প্রভাবে জ¦ালানি আমদানি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে, তাতে সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ পাঠিয়েছে। তবে সেটি মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন মেলেনি।
বিপিডিবি সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রিসভা বৈঠকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বশেষ বিদ্যুতের গড় পাইকারি দাম ৭ টাকা ০৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। তবে সেই দাম নির্ধারিত হলেও পিডিবির প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় থেকে কম ছিল। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও গ্রাহকের কাছে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বিশাল ঘাটতি হয়। ওই ঘাটতির টাকা সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে আংশিক প্রদান করে সমন্বয় করে আসছে। মন্ত্রিসভায় পাঠানো প্রস্তাবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বর্তমান বিদ্যমান পাইকারি বিদ্যুতের দামে বিদ্যুৎ বিক্রির ফলে চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। একইসঙ্গে ইরানযুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে এলএনজি, জ¦ালানি তেল, কয়লা আমদানি করতে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে আরও অনেক বেশি ভর্তুকি দিতে হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পিডিবি দাম সমন্বয়করণের একটি সমাধান হিসেবে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বৃদ্ধির তিন ধরনের প্রস্তাব করে। সেটিই বিদ্যুৎ বিভাগ মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পাঠিয়েছিল। সেগুলো হলো, বিদ্যুতের পাইকারি দাম বা বাল্ক ট্যারিফÑ প্রতি ইউনিট ৫০ পয়সা বৃদ্ধি করা, তাতে সরকারের ৫ হাজার ২৪৪ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা ভর্তুকি কমবে। অন্যদিকে প্রতি ইউনিট এক টাকা বৃদ্ধি করলে ১০ হাজার ৪৮৯ দশমিক ১৬ কোটি টাকা এবং প্রতি ইউনিট যদি এক টাকা ২০ পয়সা দাম বাড়ানো হয়, তবে সরকারের ১২ হাজার ৫৮৬ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা ভর্তুকি কমে আসবে।
দাম বাড়ানোর যুক্তি তুলে ধরে বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলেছে, নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় মেনিফেস্টোতো বলা হয়, আগামী দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করা হবে না। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ফার্নেস অয়েল এবং ডিজেলের সংকট দেখা দিতে শুরু করেছে। সরকার সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে উৎপাদন বজায় রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে হলেও যথাসম্ভব এলএনজি সংগ্রহ করে এর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি অব্যাহতভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দাম বাড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে খুচরা পর্যায় বা গ্রাহক পর্যায়েও দাম বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর বিষয়ে বলা হয়েছে, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর গ্রাহক (লাইফলাইন) থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহক, প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহক রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহকের ক্ষেত্রে কোনো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়নি। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে অধিকতর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের সর্বোচ্চ ০.৭০ টাকা থেকে এক টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগ অধিকতর যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বিভিন্ন দেশের জ¦ালানির দাম বাড়ানোর যুক্তি। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে শ্রীলংকার দাম বাড়ানোর কথা বলা হয়। শ্রীলংকায় যুদ্ধের কারণে আবাসিকে ৭.২ শতাংশ, শিল্পে ৮.৭ শতাংশ এবং হোটেল বা সেবা খাতে ৯.৯ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা বলেছে। বলা হয়েছে সিঙ্গাপুরে বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে।
এ ছাড়া সারসংক্ষেপে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি কারিগরি মিশন বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে দুই সপ্তাহব্যাপী যৌথ বৈঠক করে। সেখানে দেশের বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ভর্তুকি কমাতে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। পরে আইএমএফ মিশন টিম দেশের বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ভর্তুকি হ্রাসে ৩ বছর মেয়াদি একটি রোডম্যাপ প্রণয়নসহ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা প্রদানের সুপারিশ করে। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা দরকার মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগ রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) প্রস্তুত করা বিদ্যুতের পাইকারি দাম বৃদ্ধির তিনটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৭.০৪ টাকা থেকে ০.৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭.৫৪ টাকা; ৮.০৪ টাকার বিদ্যুৎ ১.২০ টাকা বৃদ্ধি করে ৮.২৪ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ মন্ত্রিসভার অনুমোদনসাপেক্ষে গেজেট আকারে প্রকাশ করার অনুমোদন চেয়েছে।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠালেও মন্ত্রিসভা সেটা অনুমোদন দেয়নি। তিনি বলেন, এত বিশাল পরিমাণ ভর্তুকি কীভাবে আরও কমিয়ে আনা যায়, তার নানা দিক বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পরে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকায় সেই কমিটির বৈঠক এখনও হয়নি বলে জানা যায়। ওই কর্মকর্তা বলেন, এমনিতেই বিদ্যুৎ খাতে বিশাল ভর্তুকি আছে। যুদ্ধের কারণে সেটা আরও বাড়বে। দাতা সংস্থার চাপ রয়েছে ভর্তুকি কমানোর। অন্যদিকে সরকার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে সেই চিন্তা করছে। অন্যদিকে এত বিশাল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে অর্থনীতি ঠিক রাখাও কঠিন চ্যালেঞ্জ।

