হেমায়েত হোসেন, হিউস্টন, টেক্সাস (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ইস্ট হিউস্টনের ম্যাগনোলিয়া পার্ক এলাকায় দেশটির কেন্দ্রীয় অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই বা আইস) এক এজেন্টের গুলিতে ৫২ বছর বয়সী স্থানীয় কনস্ট্রাকশন কন্ট্রাক্টর লরেঞ্জো সালগাদো আরাউজো নিহত হয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিউস্টন সিটি হলে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
ফেডারেল (কেন্দ্রীয়) কোনো সংস্থার এই মারাত্মক অভিযানের পর, স্থানীয় একটি সিটি কর্তৃপক্ষের সেই ঘটনার তদন্ত করার আইনি অধিকার বা বাধ্যবাধকতা কতটুকু—তা নিয়ে হিউস্টনের মেয়র জন হুইটমায়ার এবং সিটি কাউন্সিলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের মধ্যে তীব্র এখতিয়ারগত বিরোধ তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কটি মূলত স্থানীয় নগর প্রশাসনের একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে—স্থানীয় কোনো বাসিন্দা ফেডারেল এজেন্সির হাতে নিহত হলে, শহর কর্তৃপক্ষ কি স্বাধীনভাবে তার তদন্ত করতে পারে?
গত মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৬টা ৫০ মিনিটে ক্যানাল স্ট্রিট এবং ওয়েসাইড ড্রাইভের সংযোগস্থলের কাছে এই মারাত্মক ঘটনাটি ঘটে, যা এই অঞ্চলে ইতিমধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় অভিবাসন কর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ফেডারেল অভিবাসন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিযান বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্তত অষ্টম ঘটনা।
নিহত আরাউজো একজন মেক্সিকান নাগরিক। ৩৫ বছর ধরে তিনি হিউস্টন এলাকায় আবাসিক বাড়ি তৈরির কাজ করছিলেন। ঘটনার দিন সকালে তিনি তার কাজের ভ্যান চালিয়ে অন্য তিনজন কর্মীকে নিয়ে একটি নির্মাণাধীন সাইটে যাচ্ছিলেন। তার ছেলে রোনালদো সালগাদো জানান, তার বাবার কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না, তিনি নিয়মিত কর (ট্যাক্স) দিতেন এবং সম্প্রতি মার্কিন কাজের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) নিশ্চিত করার জন্য বায়োমেট্রিক ও আঙুলের ছাপের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করেছিলেন।
এদিকে, এই ভোরের সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসায় স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) দাবি করেছে, চালক (নিহত আরাউজো) তাদের একাধিক মৌখিক নির্দেশ অমান্য করেছেন, আইসের একটি গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছেন এবং ভ্যানটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এক কর্মকর্তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে আত্মরক্ষার্থে ওই এজেন্ট গুলি চালাতে বাধ্য হন।
অন্যদিকে, লিগ অব ইউনাইটেড ল্যাটিন আমেরিকান সিটিজেনস (লুল্যাক) এবং টেক্সাস সিভিল রাইটস প্রজেক্টসহ একাধিক মানবাধিকার সংস্থা এবং মার্কিন প্রতিনিধি সিসিলিয়া গার্সিয়া ও আল গ্রিন উল্টো অভিযোগ তুলেছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, আইস মূলত কোনো লোগো বা চিহ্নহীন (আনমার্কড) গাড়ি ব্যবহার করেছিল। নিহতের পরিবারের দাবি, চালক যদি গাড়ি চালিয়ে চলেও যেতে চান, তবে তার কারণ ছিল ডাকাতি বা তার নির্মাণকাজের মূল্যবান যন্ত্রপাতি চুরির ভয়। কারণ, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য এই এলাকায় এটি একটি নিত্যদিনের আতঙ্ক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পথচারীর ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি অন্ধকার রঙের গাড়ি সাদা রঙের ওই ওয়ার্ক ভ্যানের দিকে কোনাকুনিভাবে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে এবং উভয় গাড়ির দরজা খোলা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আহত কন্ট্রাক্টর যখন ফুটপাতে পড়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন, তখনো তাকে আটক করে রাখা হয়েছিল।
ভ্যানে থাকা অন্য তিন যাত্রী, যার মধ্যে নিহতের ভগ্নিপতিও রয়েছেন, তাদের ঘটনার পরপরই ফেডারেল কর্তৃপক্ষ আটক করে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন (ইনকমিউনিকেডো) রাখা হয়েছিল। পরে তারা বাড়িতে মাত্র পাঁচ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত ফোন করার সুযোগ পান। তবে তাদের বর্তমান আইনি অবস্থা এবং তারা কোথায় আছেন, তা এখনো অনিশ্চিত।
হিউস্টনের মেয়র জন হুইটমায়ার অবশ্য জোর দিয়ে বলছেন যে, চলমান ফেডারেল তদন্তের ওপর কোনো স্থানীয় পৌরসভা বা সিটি কর্তৃপক্ষের তদন্ত আইনিভাবে প্রাধান্য পেতে পারে না। তবে স্থানীয় মেয়রের এমন অবস্থানের মধ্যেই অন্য সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করেছে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর হিউস্টন ফিল্ড অফিস এবং ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় যৌথভাবে এই মারাত্মক শক্তি প্রয়োগের ঘটনার প্রধান তদন্ত করছে। পাশাপাশি, হ্যারিস কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি শন টেয়ার নিশ্চিত করেছেন যে, তার কার্যালয়ের নাগরিক অধিকার তদন্তকারীরা ম্যাগনোলিয়া পার্কের ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউন্টির এখতিয়ারের মধ্যে থাকা সমস্ত প্রমাণ স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করছেন।
এই হত্যাকাণ্ডের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া টেক্সাসের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রূপ নিয়েছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাম ঘোষণা করেছেন যে, তার প্রশাসন এই ঘটনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মেক্সিকান নাগরিকদের ওপর কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার বা বেআইনি হত্যাকাণ্ড মেক্সিকো কখনোই বরদাশত করবে না।
ইস্ট এন্ড এলাকা জুড়ে স্থানীয় বিক্ষোভ যতই দানা বাঁধছে, ফেডারেল কর্তৃপক্ষ কিন্তু এখনো তাদের কর্মকর্তাদের গায়ে থাকা বডি-ক্যামেরা ফুটেজ, গাড়ির ড্যাশক্যাম রেকর্ডিং বা তাদের আইন প্রয়োগকারী যানের কোনো কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে কি না—তার কোনো আলোকচিত্র বা প্রমাণ প্রকাশ করেনি।

