কাদের গনি চৌধুরী
———————————————–
আজ ৭ নভেম্বর।
সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। আজ থেকে ৫১ বছর আগে এক ক্রান্তিলগ্নে এই নভেম্বর মাসে সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে পুরো জাতি মহাসঙ্কট থেকে উত্তোরণ লাভ করে। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়। একদলীয় বাকশালী সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। তারপর নভেম্বর মাসের ৩ তারিখ একটি অপশক্তি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তাই ৩ নভেম্বরের পর পুরো বাংলাদেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলে অনেক ঘটনা। চলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র। অবশেষে দেশ, জাতি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহী জনতার এক গণঅভ্যুত্থান ঘটে। মুক্তি পায় পুরো জাতি। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে চালু হয় বহুদলীয় গণতন্ত্র।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক দিবস। তারপর থেকে এ দিনটিকে পালন করা হচ্ছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে। বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালনেরও একটা প্রেক্ষাপট আছে। প্রকৃত অর্থেই ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। অপরদিকে সারাদেশের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে তৈরি হয় এক সুদৃঢ় ঐক্য। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলে বাংলাদেশ। ৭ নভেম্বরের চেতনা বাংলাদেশের আপামর জনগণেরই চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এ চেতনাকেই লালন করে বাংলাদেশের বহুমত ও বহুদলের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু দেশের একটি মহল ৭ নভেম্বরের চেতনাকে মুছে দিতে চায়। তারা চায় বহুমত ও বহুদলের গণতান্ত্রিক চেতনাকে ভুলুন্ঠিত করে একদলীয় তথা স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে। যা এদেশের আপামর জনগণের চেতনা বিরোধী।
আমরা দেশে বহুমত ও বহুদলের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। বহু ফুল ফুটতে দাও এটা হচ্ছে ৭ নভেম্বরের গণতান্ত্রিক চেতনা। আমরা এ চেতনাকেই ধারণ করি। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক চেতনার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রয়োজন। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি ছাড়া কোনো জাতি তার কাঙখিত লক্ষ্যপানে পৌঁছতে পারবে না। সরকার ও বিরোধী দলকে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতির চেতনাকে লালন করেই বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
ফিরে দেখা এই দিন :
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ধারাবাহিকতায় ওই দিনই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ তার অনুসারী সেনাসদস্যদের নিয়ে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করেন। আত্মস্বীকৃত পদোন্নতি নিয়ে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, মেজর জেনারেলের ব্যাজ ধারণ এবং সেনাপ্রধানের পদ দখল করেন। ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করেন। কথিত মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ মন্ত্রিসভা বাতিল ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার ঘোষণা দেন। একই দিনে তিনি প্রধান বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েমকে দেশের প্রেসিডেন্টের পদে এনে বসান। এভাবে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেটে যায় চার দিন। একপর্যায়ে ৬ নভেম্বর গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। সিপাহি-জনতার মিলিত সেই বিপ্লবে বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থান ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান খালেদ মোশাররফ ও তার কিছু অনুসারী। পর দিন ৭ নভেম্বর সর্বস্তরের সৈনিক ও জনতা সম্মিলিতভাবে নেমে আসে ঢাকার রাস্তায়, ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। অভূতপূর্ব এক সংহতির নজির সৃষ্টি হয় দেশের রাজনীতিতে। তারপর থেকেই ৭ নভেম্বর পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তদানীন্তন দৈনিক বাংলার রিপোর্টে বিপ্লব সম্পর্কে বলা হয়—‘সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহী-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা। ৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি’। জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। এদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহী-জনতা আলিঙ্গন করেছে একে অপরকে। নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ ধ্বনিতে ফেটে পড়ে তারা। সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবে ভণ্ডুল হয়ে যায় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী সব ষড়যন্ত্র। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ নেমে আসেন রাজপথে। সাধারণ মানুষ ট্যাংকের গলায় পরিয়ে দেয় ফুলের মালা। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব শহর-নগর-গ্রামেও পৌঁছে যায়।’
সাবেক সেনাপ্রধান লে.জে. মাহবুবুর রহমান যেভাবে মুল্যায়ন করলেন দিবসটিকেঃ
১৫ আগস্ট (১৯৭৫) জাতীয় ইতিহাসের মসিলিপ্ত এক মহাকলঙ্কিত দিন। সেদিন মধ্যরাতে এক হৃদয়বিদারক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রক্তমাখা হাতে তাঁরই দলের এক শীর্ষ নেতা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নেন আকস্মিক ও অতর্কিতে। সামরিক শাসন জারি হয়। জারি করেন কোনো সামরিক ব্যক্তিত্ব নয়, সোজাসাপ্টা কথায় ক্ষমতালিপ্সু ষড়যন্ত্রকারী দলীয় রাজনৈতিক চক্র। গভীর এক অনিশ্চয়তা, এক মহাঅস্থিরতা নেমে আসে সারা দেশে। স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীতেও এর অভিঘাতের ঢেউ আছড়ে পড়ে।
আমরা দেখেছি ১৯৭৫-এর নভেম্বরের শুরুর দিনগুলোয় দেশে এক চরম নৈরাজ্য, নৈরাশ্য, এক সীমাহীন হতাশা। অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা গোটা জাতিকে সংকটাপন্ন করে তোলে। একটা ভয়ঙ্কর ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। দেশ তখন সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন। কোনো সরকার নেই। প্রশাসন নেই। কোনো যোগাযোগ নেই। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে কোথায় যেন ছিটকে পড়েছে। হারিয়ে গেছে। এরই পটভূমিকায় ৭ নভেম্বরে গোটা দেশজুড়ে ঘটে সৈনিক-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান। জাতির ভাগ্যাকাশে এ ছিল কঠিন যুগসন্ধিক্ষণ— এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কবিতার ভাষায়—
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার।
… না নৌকাডুবি হয়নি। জিয়া অদম্য সাহসের সঙ্গে বজ্রকঠিন শক্ত হাতে সেই উত্তাল সমুদ্রে নোঙরবিচ্ছিন্ন ডুবুডুবু তরীটির হাল ধরেন।
দেশ তখন সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন। কোনো সরকার নেই, প্রশাসন নেই, যোগাযোগ নেই। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। গোটা বাংলাদেশ যেন গোটা বিশ্ব থেকে কোথায় ছিটকে পড়েছে, হারিয়ে গেছে। সিপাহি-জনতার উত্তাল তরঙ্গমালায় সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া উঠে আসেন জাতীয় নেতৃত্বের পাদপ্রদীপে নেতৃত্বের অসীম শূন্যতায়। সময়টা ছিল জাতির জন্য সত্যি চরম ঝুঁকিপূর্ণ-মহাক্রান্তিলগ্ন। সেনাবাহিনীতে কোনো শৃঙ্খলা নেই। নেই চেইন অব কমান্ড, নেই সেনারীতি-নীতি। সৈনিকরা সেনাছাউনি থেকে বেরিয়ে সবাই রাজপথে, লোকালয়ে জনতার সঙ্গে অস্ত্রহাতে। জিয়ার জন্য এটা ছিল এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা তখন সহজ কাজ ছিল না। খাঁচা থেকে যেন বাঘ লোকালয়ে বেরিয়ে এসেছে, তাকে আবার ব্যারাকের মধ্যে ফিরিয়ে আনা কঠিন। জেনারেল জিয়ার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, অসীম সাহসিকতা, আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, দেশবাসীর চরম আস্থা, জিয়াকে জাতীয় এই চরম সংকট উত্তরণে সাহায্য করে।
জেনারেল জিয়া উল্কার মতো ছুটে চলেছেন প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত, এক সেনানিবাস থেকে আরেক সেনানিবাস, এক ব্রিগেড থেকে আরেক ব্রিগেড, এক ইউনিট থেকে আরেক ইউনিট। বাংলাদেশের প্রতিটি সেনাছাউনি তিনি চষে বেড়িয়েছেন। জনতার ঢল, সৈনিকের ভিড়, এর মধ্য দিয়ে দৃপ্ত পদভারে সামনে এগিয়ে চলেছেন।
আমার মনে পড়ে ঢাকা সেনানিবাসে তিনি এ সময় এক সৈনিক দরবারে এসেছিলেন। মাঠে অস্ত্র উঁচিয়ে উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকের ভিড়। চতুর্দিকে মুহুর্মুহু স্লোগান— ‘জিয়া ভাই জিয়া ভাই’। ঢাকা সেনানিবাসের আকাশ-বাতাস মুখরিত। পতাকাবাহী গাড়ি রাস্তায় রেখে তিনি হেঁটে সৈনিকদের ঠিক মাঝখানে চলে আসেন। মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করেন, Shut-up. I am not Zia Bhai. I am bloody well your Chief. Behave properly. ‘তোমরা সবাই চুপ কর। আমি তোমাদের ভাই নই। আমি তোমাদের সেনাপ্রধান। সাবধানে কথা বল। সেনাশৃঙ্খলা ভঙ্গ আমি কখনো সহ্য করব না।’ তিনি সবাইকে ব্যারাকে যাওয়ার আদেশ দেন। অস্ত্র জমা দিতে বলেন এবং চেইন অব কমান্ডে ফিরে আসতে বলেন। অবাক বিস্ময়ে আমি লক্ষ্য করি, মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ, সৈনিকরা লাইন ধরে একে একে শৃঙ্খলার সঙ্গে আপন আপন ইউনিটের দিকে হেঁটে চলছে। আমার কাছে সেদিন জিয়াকে মনে হয়েছিল তিনি যেন সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক। যার বাঁশির সুরে হ্যামিলন নগরীর সব শিশু-কিশোর যে যেখানে ছিল তার পেছনে ছুটে চলেছে।
জেনারেল জিয়া তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হীনমন্যতায় ভোগা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তার প্রাইড ফিরিয়ে দেন। তিনি সেনাবাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। সেনাবাহিনীকে সুপ্রশিক্ষিত পেশাগতভাবে সুদক্ষ অস্ত্র ও সমরসম্ভারে সুসজ্জিত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক মনোযোগ দেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পেশা-দক্ষ ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী হিসেবে জনগণের পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা অর্জন করে। জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার মূর্তপ্রতীকে পরিণত হয় আক্ষরিক অর্থেই।
জিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, ‘জনগণ এবং জনগণই একমাত্র সকল ক্ষমতার উৎস’। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথম যে কাজটি করেন তা হলো, সামরিক সরকারের পূর্ণ বেসামরিকীকরণ। তিনি সব রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রচর্চার পূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। আওয়ামী লীগ তখন একটা কঠিন সময় অতিক্রম করছিল। ইতিপূর্বে বাকশালের ধারালো ছুরিতে দল দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। দলের অনেক শীর্ষ নেতা মোশতাক সরকারে যোগদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছিলেন। জিয়া তাঁকে নিজ দেশে সসম্মানে ফিরে আসার সাদর আহ্বান জানান। তাঁকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পূর্ণ সহযোগিতার নিশ্চয়তা প্রদান করেন।
বাংলাদেশের তদানীন্তন রাজনীতির বাস্তবতা জেনারেল জিয়াকে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে বাধ্য করে। তাঁর ছিল গণতন্ত্রের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস। সত্যিকারের গণতন্ত্রের চেতনায় তাড়িত হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম সুযোগেই তিনি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন ঘটান। সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তিনি কৃষিবিপ্লব ও শিল্পের বিকাশ ঘটান। জাতিকে একটি মর্যাদাশীল সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড় করান।
জিয়ার শাসনকাল সংক্ষিপ্ত হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সুবর্ণ যুগ। তিনি ’৭১-এর মতো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রচনা করেন। অতি কাছের শক্তিশালী গণচীনসহ অনেক বৃহৎ দেশ বাংলাদেশের প্রতি মৈত্রী ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির অতিসম্মানীয় আসন অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানকে নির্বাচনে পরাজিত করে বাংলাদেশ অর্জন করে। জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একত্রিত করে শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্ক জোট গঠনে উদ্যোগ নেন। সার্ক এককভাবে জিয়ার চিন্তাপ্রসূত।
জিয়া সেনাবাহিনী থেকে মেয়াদ পূরণের অনেক আগেই স্বেচ্ছায় পূর্ণ অবসর গ্রহণ করেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে তিনি নিজে দল গঠন করেন। তিনি বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে শহরে-বন্দরে পথে-প্রান্তরে বিরামহীনভাবে ঘুরে বেড়ান। জনগণের সঙ্গে তাদেরই পরিবারের একজন হয়ে যান। তিনি শত শত মাইল পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে বেড়ান। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শোনেন। সাহস জোগান। মানুষ তাঁকে আপন করে নেয়। গৃহবধূরা তাঁকে বাড়ির ভিতরে উঠানে নিয়ে বসান। রান্নাঘরে মাটির সানকিতে ঘরে যা আছে খেতে দেন। বৃদ্ধারা শুধু মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। আবালবৃদ্ধবনিতা হ্যামিলনের সেই বংশীবাদকের মতো তাঁর পেছনে স্রোতধারার মতো ছুটে চলে। বিশ্বে তিনি খ্যাত হন চারণ রাষ্ট্রপতি নামে। গোটা বাংলাদেশটাই হয়ে ওঠে জিয়ার আপন ঘর। পৃথিবীর খুব কম সমরনায়কই রাজনীতির অজানা অঙ্গনে এত অল্প সময়ে এমন জনদরদি জননেতা হতে পেরেছেন। একজন সমরনায়কের এমন আমূল পরিবর্তন, রণ থেকে জনে এমন বিশাল বিবর্তন সত্যি বিরল। সমরনায়ক জিয়া নিজেকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিলে তিলে নির্মাণ করতে পেরেছিলেন নিখাদ, নিষ্কলুষ এক জনগণমন অধিনায়ক হিসেবে।
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

