ঢাকা২৪শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বেবিচকের উচ্চতার ছাড়পত্রে ‘ঘুষ সিন্ডিকেট’ অভিযোগ

admin
জুন ২৪, ২০২৬ ৫:২৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্টাফ রিপোর্টার

একটি ভবন কত তলা হবে কিংবা কত ফুট পর্যন্ত মাথা তুলতে পারবে বিষয়টি শুধু নগর পরিকল্পনার নয়; বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় এটি সরাসরি জড়িয়ে আছে উড়োজাহাজের নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণের সঙ্গে। সেই স্পর্শকাতর উচ্চতার ছাড়পত্র (হাইট ক্লিয়ারেন্স) নিয়েই এবার উঠেছে ভয়াবহ অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) থেকে উচ্চতার ছাড়পত্র দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, অনলাইনে আবেদন করেও নিয়ম অনুযায়ী সময়মতো ছাড়পত্র মিলছে না; বরং ঘুষ বা প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা ছাড়া অনেক আবেদনই আটকে রাখা হচ্ছে।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা বাদশা দিদারুল সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বেবিচক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। নির্দেশনার একটি অনুলিপি দৈনিক সমাচারের হাতে এসেছে।

জানা গেছে, ডিজিটাল সেবা সহজ করার উদ্দেশ্যে উচ্চতার ছাড়পত্রের আবেদন অনলাইনে নেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক আবেদনকারীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও ১৫ দিন থেকে চার মাস পর্যন্ত ফাইল ঝুলে থাকে। তবে দালাল বা নির্দিষ্ট যোগাযোগের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা দিলে একই ধরনের আবেদন কয়েক দিনের মধ্যেই অনুমোদন পাচ্ছে।

নির্মাণসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ভবন নির্মাণ খাতে সময়ই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। ব্যাংক ঋণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা সবকিছু নির্ভর করে সময়মতো ছাড়পত্রের ওপর। এই বাস্তবতাকেই চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি উচ্চতার ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়ে। লিখিত অভিযোগে একাধিক নির্দিষ্ট ছাড়পত্র নম্বর উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে যেখানে প্রকৃত অনুমোদনযোগ্য উচ্চতার চেয়ে বেশি উচ্চতা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও ৫১ ফুটের জায়গায় ৬৯ ফুট, ৫৯ ফুটের পরিবর্তে ১০৭ ফুট, ৩৪ ফুটের স্থলে ৭৮ ফুট এবং ১৮৬ ফুটের বদলে ২১৫ ফুট পর্যন্ত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব অনুমোদনের পেছনে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। লিখিত অভিযোগে বেবিচকের সিনিয়র কার্টোগ্রাফার মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ ও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি পরিচালক (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মো. শামসুল হকসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের অবস্ট্যাকল লিমিটেশন সারফেস (ওএলএস) এলাকায় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্ক আবেদন সংগ্রহ, তদবির এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, ওএলএস কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয় এটি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিমানবন্দরের আশপাশে কোথায় কত উচ্চতার স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে, তা সম্পূর্ণ কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এই সীমা অতিক্রম করলে উড়োজাহাজের নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বেবিচকের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওএলএস–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয় নয় এটি পুরোপুরি নিরাপত্তাভিত্তিক। অভিযোগ সত্য হলে সেটি শুধু দুর্নীতির নয়, বিমান নিরাপত্তারও বিষয়।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সিনিয়র কার্টোগ্রাফার শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং এ বিষয়ে কিছু জানেন না।

অন্যদিকে পরিচালক (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মো. শামসুল হক বলেন, কার্টোগ্রাফারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে তার নাম কেন যুক্ত করা হয়েছে, তা তার জানা নেই। তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম বা অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চতার ছাড়পত্র কোনো সাধারণ প্রশাসনিক অনুমোদন নয় এটি একটি নিরাপত্তা সনদ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিমান নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং জনস্বার্থ। ফলে এ সেবাকে ঘিরে ঘুষ, দালালচক্র বা বিধিবহির্ভূত অনুমোদনের অভিযোগ উঠলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয় রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিরও প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং প্রতিটি অনুমোদনের কারিগরি ভিত্তি প্রকাশ করলে দুর্নীতি ও তদবিরের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।