সত্য সমাচার ডিজিটাল:
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্ব এখন শুধু শ্রমশক্তি রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিস্তৃত পরিসরে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে।
একই সঙ্গে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো’ সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
আজ সোমবার পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম যে শুভেচ্ছা বার্তাগুলোর একটি তিনি পেয়েছিলেন, তা ছিল আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে। সেই আমন্ত্রণেই তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম সরকারি বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় এসেছেন।
বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালের মালয়েশিয়া সফর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের সফরের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ওই সফরগুলো দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী জানান, আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তার বিস্তৃত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে। উভয় দেশ বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তিনি বলেন, যৌথ কমিশন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পৃক্ততা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জনগণের শক্তিশালী সমর্থনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকার হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য অন্যতম সম্ভাবনাময় গন্তব্য। অবকাঠামো, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিক্ষা খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
শ্রমবাজার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন। তাদের অবদান উভয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে তিনি আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশই একমত হয়েছে যে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে এবং শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় হ্রাস পায়।
সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা চায় এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-এ যোগদানে আগ্রহী।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতার বিষয়েও দুই নেতা আলোচনা করেছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন দেওয়ায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আজকের আলোচনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। শ্রম, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা যৌথ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাব।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার সহধর্মিণীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্বের গল্প এখন নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় হবে আরও গভীর, আরও বিস্তৃত এবং আরও ফলপ্রসূ।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে শ্রমবাজারে বিদ্যমান অনিয়ম, শোষণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতো’ সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে বিপুল সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মালয়েশিয়াকে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ায় তিনি আনন্দিত। তিনি এটিকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতি বাংলাদেশের আস্থার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখন সময় এসেছে এ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার। এ লক্ষ্যে দুই দেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশি কর্মীদের বিষয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘আমাদের শ্রমিক প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা। শ্রমিকদের শোষণ, দুর্ব্যবহার কিংবা ব্যক্তিগত ও করপোরেট স্বার্থে তাদের ব্যবহার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।’
তিনি জানান, শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত করতে উভয় দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, দুই দেশের সহযোগিতা শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, এআই, ডিজিটাল অর্থনীতি, জ্বালানি এবং উন্নত উৎপাদন শিল্পেও তা সম্প্রসারিত হবে। তিনি জানান, বৈঠকে পেট্রোনাস ও পেট্রোবাংলার সহযোগিতা, হালাল শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটন খাতে অংশীদারত্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আশ্রিত শরণার্থীদের দুর্ভোগ লাঘব এবং মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে টেকসই সমাধান খুঁজতে আসিয়ান কাঠামোর আওতায় কাজ অব্যাহত থাকবে।
ফিলিস্তিন ও গাজা পরিস্থিতি নিয়েও দুই দেশের অভিন্ন অবস্থানের কথা উল্লেখ করে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পক্ষে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া একসঙ্গে কাজ করে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘পরিবারের সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক বন্ধন ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এর আগে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের জন্য স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টায় শাংগ্রিলা হোটেল থেকে মোটর শোভাযাত্রাসহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান পুত্রজায়ার উদ্দেশে রওনা হন।
পরে সকাল ৯টায় মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পেরদানা পুত্রা’ ভবন প্রাঙ্গণে পৌছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার সহধর্মিণী দাতুক সেরি ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল। এ সময় মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আহমদ জাহিদ হামিদি এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
এরপর লালগালিচায় তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানকে মালয়েশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন।
রয়্যাল মালয় রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নের ১০৩ জন সদস্য ও তিনজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত এই গার্ড অব অনারের নেতৃত্ব দেন মেজর নূর আহমদ যায়েম জাহারি। পরে দুই নেতা নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং পুত্রজায়া মসজিদকে পটভূমিতে রেখে আনুষ্ঠানিক ফটোসেশনে অংশ নেন।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক। বৈঠকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের সার্বিক বিষয়, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি সহযোগিতা, শিক্ষা, হালাল শিল্প, জ্বালানি খাত এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা শ্রমবাজার পুনরায় সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি ছিলো এ বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। একান্ত বৈঠকের পর প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন দুই দেশের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নয়ন এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

