অনলাইন ডেস্ক
২৩ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও কূটনীতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যে নতুন মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণায় আপাতত স্বস্তির আভাস মিললেও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অচলাবস্থা, নৌ-অবরোধ এবং পাল্টাপাল্টি শক্তি প্রদর্শন সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার পথ খুলতে চেষ্টা চলছে, কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দোলাচলে রেখেছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন একটাইÑ এই যুদ্ধবিরতি কি স্থায়ী শান্তির পথ খুলবে, নাকি বড় সংঘাতের আগে সাময়িক বিরতিমাত্র?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। পাকিস্তানের অনুরোধে নেওয়া এ সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলোÑ ইরানকে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব’ উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া এবং কূটনৈতিক আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া।
সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতিকে অনির্দিষ্টকাল দীর্ঘায়িত করতে আগ্রহী নয়। বরং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। তবে একই সঙ্গে ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ বজায় রেখে চাপ ধরে রাখার কৌশলও অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া যুদ্ধবিরতির অন্যতম শর্ত ছিল। কিন্তু অবরোধ ও পাল্টা পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি এখনও অচলাবস্থায় রয়েছে।
পাকিস্তান এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় উঠে এসেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের প্রস্তুতি চললেও তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে না নিলে তারা আলোচনায় বসবে না।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি বলেছেন, অবরোধ প্রত্যাহার হলেই তারা আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত। তবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধের শর্তও দিয়েছে তেহরান।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা অবস্থানের কারণে এই নৌপথ কার্যত অচল।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একাধিক জাহাজে হামলা ও দুটি জাহাজ জব্দ করার কথা জানিয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র বলছে, অন্তত তিনটি কনটেইনার জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে, কারণ বৈশ্বিক তেল ও এলএনজির উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। দেশটির শ্রম উপমন্ত্রী জানিয়েছেন, অন্তত ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। তেল-গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাতসহ গুরুত্বপূর্ণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে ডিজিটাল অর্থনীতিও স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেকই এখন ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইসরায়েল-লেবানন ফ্রন্ট ও নতুন উত্তেজনা : ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে আলোচনা চলছে। তিনি চারটি শর্ত তুলে ধরেছেনÑ ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ, সেনা প্রত্যাহার, বন্দিবিনিময় এবং লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন।
এদিকে দক্ষিণ লেবাননে হামলায় আহত এক ফরাসি শান্তিরক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘের প্রাথমিক তদন্তে এটিকে ‘পরিকল্পিত হামলা’ বলা হয়েছে, যেখানে হিজবুল্লাহর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
সিরিয়া সীমান্তে নতুন বিতর্ক : একই সময়ে সিরিয়ায় অনুপ্রবেশের ঘটনায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ধারণার সমর্থক প্রায় ৪০ জন ইসরায়েলি সেটলার সীমান্ত অতিক্রম করে বাফার জোনে ঢুকে পড়েন। পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের ফিরিয়ে এনে আটক করে।
সামরিক প্রস্তুতি ও অস্ত্রভাণ্ডারের চাপ : যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। সেন্টকম জানিয়েছে, তারা নতুন করে অস্ত্রসজ্জা ও রণকৌশল পুনর্বিন্যাস করছে। অন্যদিকে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের ‘প্যাট্রিয়ট’ ও ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করে ফেলেছে, যা ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা, অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনাÑ দুইয়ের টানাপড়েনে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতি টেকসই চুক্তিতে রূপ নেবে, নাকি নতুন করে সংঘাত শুরু হবেÑ তা এখন নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

