সন্তান জন্মের পর একটি পরিবারের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। নবজাতকের যত্ন, অনিয়মিত ঘুম, নতুন দায়িত্ব এবং মানসিক চাপ-সব মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর দৈনন্দিন জীবন আগের মতো থাকে না। অনেক সময় দু’জন মানুষ একে অপরের সঙ্গী হওয়ার চেয়ে সন্তানের মা-বাবা হিসেবেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হওয়া বা ঘনিষ্ঠতা কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তান জন্মের পর শারীরিক, মানসিক ও হরমোনজনিত নানা পরিবর্তনের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। ক্লান্তি, ঘুমের অভাব এবং নতুন দায়িত্বের চাপ সম্পর্কের রসায়নেও পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই পরিস্থিতি সাধারণত সাময়িক। যদি দীর্ঘদিন ধরে দূরত্ব বা অস্বস্তি বজায় থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।
সম্পর্ককে সুস্থ ও উষ্ণ রাখতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ কিন্তু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন—
দিনে অন্তত একবার একসঙ্গে খাবার খান
ব্যস্ততার মাঝেও দিনে অন্তত একবার একই টেবিলে বসে খাওয়ার চেষ্টা করুন। সেই সময় মোবাইল ফোন দূরে রেখে একে অপরের সঙ্গে কথা বলুন। দিনের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি কিংবা ছোটখাটো বিষয় নিয়েও আলাপ করুন। নিয়মিত এই সময়টুকু পারস্পরিক যোগাযোগকে আরও শক্তিশালী করে।
ভুল হলে ক্ষমা চাইতে দ্বিধা করবেন না
যেকোনো সম্পর্কেই মতবিরোধ বা ঝগড়া হতে পারে। তবে অহংকার ধরে রাখার বদলে ভুল স্বীকার করে ‘সরি’ বলতে পারলে অনেক বড় সমস্যাও সহজে মিটে যায়। ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতার নয়, বরং সম্পর্কের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
রাতে মোবাইল নয়, সময় দিন একে অপরকে
ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ফোনে ব্যস্ত থাকার অভ্যাস সম্পর্কের দূরত্ব বাড়াতে পারে। তাই রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর মোবাইল সরিয়ে রেখে কিছুটা সময় শুধু দু’জনের জন্য রাখুন। গল্প করুন, দিনের ভালো-মন্দ ভাগাভাগি করুন কিংবা নীরবে একসঙ্গে সময় কাটান।
শুধু সংসারের নয়, মনের কথাও শুনুন
দৈনন্দিন কাজের তালিকার বাইরে গিয়েও সঙ্গীর মানসিক অবস্থার খোঁজ নিন। ‘আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?’ কিংবা ‘কোনো কিছু নিয়ে চিন্তায় আছ?’এমন প্রশ্ন অনেক না-বলা অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে।
মাসে অন্তত একদিন রাখুন শুধু দু’জনের জন্য
ডেট মানেই ব্যয়বহুল রেস্তোরাঁ বা বড় আয়োজন নয়। একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, প্রিয় কোনো ক্যাফেতে বসে কফি পান করা কিংবা নিরিবিলি কোথাও কিছুটা সময় কাটানোও সম্পর্ককে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। ওই সময়টুকু যেন শুধু দু’জনের জন্যই থাকে।
সন্তানের সামনে তর্ক বা ঝগড়া এড়িয়ে চলুন
মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে তা সন্তানের সামনে প্রকাশ না করাই ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের পরিবেশ শিশুর মানসিক ও আবেগিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই গুরুতর আলোচনা ব্যক্তিগতভাবে করাই উত্তম।
সব দায়িত্ব একা নয়, ভাগ করে নিন
অনেক সময় ঝগড়ার মূল কারণ রাগ নয়, বরং অতিরিক্ত ক্লান্তি। তাই সন্তান লালন-পালন কিংবা সংসারের দায়িত্ব একা বহন না করে সঙ্গী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সহযোগিতা নিন। একই সঙ্গে নিজের অনুভূতি ও প্রয়োজন স্পষ্টভাবে প্রকাশ করুন। অন্যজন সব সময় না বললেও বুঝে যাবে এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো।
প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন
যদি দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কের দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব বা মানসিক অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না হয়, তাহলে মনোবিজ্ঞানী বা দাম্পত্য পরামর্শকের সাহায্য নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সময়মতো সঠিক পরামর্শ অনেক সম্পর্ককেই নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান নিঃসন্দেহে একটি পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান সদস্য। তবে সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে দাম্পত্য সম্পর্ককে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ায় ভরা একটি সুখী দাম্পত্যই শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, ইতিবাচক ও মানসিকভাবে সুস্থ বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে।

