লিওনেল মেসির ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু কবে তিনি বুটজোড়া তুলে রাখবেন কিংবা আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচটি খেলবেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্যারিয়ারের পর তিনি কী গড়ে তুলবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এই মুহূর্তে জাতীয় দলের হয়ে নিজের শেষ ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মেসি। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে নামবেন তিনি। ম্যাচটি বহন করছে অসাধারণ ঐতিহাসিক ও আবেগঘন গুরুত্ব।
ক্যারিয়ারে এটি হবে মেসির ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা এই ফুটবল কিংবদন্তি এবার আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিদায় জানাবেন। দীর্ঘ বছর ধরে গড়ে তোলা এমন এক উত্তরাধিকার তিনি রেখে যাচ্ছেন, যার পুনরাবৃত্তি করা প্রায় অসম্ভব।
আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে অনেকেই মেসিকে কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনার পাশে রাখেন। দেশকে বিশ্বকাপ জেতানো থেকে শুরু করে জাতীয় দলের ইতিহাসে মেসি রেখে গেছেন অমোচনীয় ছাপ।
গত ৩১ আগস্ট আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হারের মাত্র ছয় সপ্তাহ পরই এই সিদ্ধান্ত জানান তিনি। মেসি বলেছিলেন, জাতীয় দলকে দেওয়ার মতো আর কিছু আছে বলে তিনি মনে করছেন না।
তবে দরজা খোলা রেখেছিলেন লিওনেল স্কালোনি। আর্জেন্টিনার কোচ তার অধিনায়ককে বলেছিলেন, চাইলে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন তিনি। এই পর্যায়ে এসে মত পরিবর্তন করায় লজ্জার কিছু নেই বলেও জানিয়েছিলেন স্কালোনি।
তবে এখন সবকিছুই একই দিকে ইঙ্গিত করছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির অধ্যায় সত্যিই শেষের পথে।
ক্লাব ফুটবলে অবশ্য এখনই অবসরের কোনো ইঙ্গিত নেই। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে মেসির চুক্তি ২০২৮ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত। অবশ্য প্রতি বছর চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠজনেরা মনে করেন, নির্ধারিত সময়ের আগে ক্লাব ছাড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
শারীরিক ও মানসিকভাবে খেলা চালিয়ে যেতে পারলে চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও প্রবল। তবে এরপর কী করবেন মেসি—এ প্রশ্ন করলে তার কাছের মানুষরা শুধু মুচকি হাসেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার অভ্যাস কখনোই মেসির ছিল না। বরং তিনি সব সময় পরের ম্যাচ ও সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ নিয়েই ভাবতে অভ্যস্ত।
তারপরও পরবর্তী অধ্যায়ের একটি চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। ফুটবলের সঙ্গে মেসির সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কঠিন বলেই মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগের দিকে আগ্রহ বাড়াচ্ছেন তিনি। সবুজ মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে ইতিমধ্যে নিজের একটি বিশাল সাম্রাজ্যের ভিত্তিও গড়ে তুলতে শুরু করেছেন।
কোনো ক্লাবের ক্রীড়া পরিচালক হওয়া কিংবা ক্লাব সভাপতির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা দীর্ঘদিন ধরেই মেসির আগ্রহের জায়গা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকতে চান তিনি। তবে কোনো নির্বাহী পদে থাকা ব্যক্তিদের মতো নিয়মিত ভ্রমণ, ফোনকল ও বৈঠকের চাপের মধ্যে থাকতে চান না।
সম্প্রতি তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোচ হওয়া নাকি ক্লাবের মালিক হওয়া—কোনটি বেশি পছন্দ? মেসি স্পষ্টভাবেই মালিক হওয়ার পক্ষে মত দেন। কারণটাও তার কাছে পরিষ্কার। একজন কোচকে প্রতি সপ্তাহে ফলাফলের চাপ সামলাতে হয়, অসংখ্য খুঁটিনাটি বিষয় দেখতে হয় এবং চোট, সংকট ও সমালোচনার সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করতে হয়।
অন্যদিকে মালিক তুলনামূলক শান্ত অবস্থান থেকে ক্লাবের সামগ্রিক পথ নির্ধারণ করতে পারেন। ম্যাচের চাপ থেকেও তিনি কিছুটা দূরে থাকতে পারেন। তবে শুধু কোচ নিয়োগ করে পেছনে সরে যাওয়া মালিক হতে চান না মেসি। ক্লাবের খুঁটিনাটি বিষয়ে যুক্ত থাকতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি অনুসরণ করতে চান তিনি।
স্পেনে এরই মধ্যে নিজের ফুটবল প্রকল্পের প্রথম ধাপ শুরু করেছেন মেসি। বার্সেলোনার উপকণ্ঠে অবস্থিত এবং পঞ্চম স্তরের লিগে খেলা ইউই কর্নেয়া গত এপ্রিলে মেসির মালিকানায় আসে। তরুণ প্রতিভা গড়ে তোলার কেন্দ্র হিসেবে ক্লাবটিকে ব্যবহার করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
এরপর আসে স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের দল সিডি এলদেন্সে। গত ১ অক্টোবর ঘোষণা করা হয়, ক্লাবটির মালিকানা মেসির হাতে যাচ্ছে। তবে এর জন্য স্পেনের উচ্চ ক্রীড়া পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি।
মেসির পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে এলদেন্সে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চলতি মৌসুমে প্রথম লক্ষ্য খুবই সাধারণ—অবনমন এড়ানো। এ কারণেই ভিয়ারিয়ালের সাবেক কোচ হাভি কায়েহা দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। একই সময় ক্লাবটিতে এসেছে নতুন মালিকানাও।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেসির আস্থাভাজন কয়েকজন ব্যক্তি দুই ক্লাবের দায়িত্ব সামলাবেন। তারা মেসি ও ক্লাবগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করবেন, যতক্ষণ না মেসি নিজে আরও গভীরভাবে প্রকল্পে যুক্ত হতে পারেন। তবে দূর থেকে শুধু ফলাফল দেখেই থেমে থাকেন না তিনি। নিজের কম্পিউটারে নিয়মিত এলদেন্সের ম্যাচ দেখেন মেসি।
নতুন মালিক হিসেবে প্রথম বার্তাটিও তিনি দেন রেয়াল ওভিয়েদোর বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ের পর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আউপা দেপোর্তিভো’—যার অর্থ উৎসাহ দিয়ে বলা, ‘চলো দেপোর্তিভো।’
মেসির নাম আসতেই ক্লাবটির প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ১২টি প্রতিষ্ঠান ক্লাবটির পৃষ্ঠপোষক হওয়ার আবেদন করে। এর মধ্যে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও ছিল, যারা আগের মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মেসির আগে থেকেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।
উরুগুয়েতেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু লুইস সুয়ারেসকে সঙ্গে নিয়ে আরেকটি প্রকল্প শুরু করেছেন মেসি। ২০২৫ সালের মে মাসে দুজন মিলে দেপোর্তিভো এলএসএম প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম মৌসুমেই দলটি দেশটির তৃতীয় বিভাগে উঠে যায়।
শুরুর দিকে আরও বড় একটি ক্লাব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন বিভাগ পেরিয়ে এসব দলকে এগিয়ে নিতে বিপুল খরচের বিষয়টি সামনে আসায় সেই আগ্রহ দ্রুত কমে যায়।
বিস্তৃত ক্লাব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা এখন আর নেই। মেসির মূল মনোযোগ এখন এলদেন্সে স্পেনের ফুটবলে নিজেদের অবস্থান কতটা শক্ত করতে পারে, সেদিকে।
মায়ামিতেও তার জন্য আরেকটি সম্পর্ক অপেক্ষা করছে। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, অবসর নেওয়ার পর ক্লাবটির মালিকানায় মেসির অংশীদারত্ব থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের নতুন কোনো ক্লাব প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা আপাতত নেই তার।
আর্জেন্টিনায় নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার ভাবনাটি অবশ্য সমর্থকদের কাছে আকর্ষণীয়। বিশেষ করে রোসারিওতে শৈশবে যে ক্লাবের হয়ে খেলেছেন, সেই নেওয়েলস ওল্ড বয়েজের প্রতি মেসির আবেগের কথা বিবেচনা করলে। তবে বাস্তবতা হলো, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।
লুইস সুয়ারেসের সঙ্গে বসে মাতের পেয়ালা হাতে হয়তো কখনো এই ভাবনা মেসির মাথায় আসে। বার্সেলোনায় ফেরার কিংবা মারাদোনার সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে জড়িয়ে থাকা নাপোলিতে স্বল্প সময়ের জন্য খেলার চিন্তাও হয়তো কখনো তার মনে উঁকি দেয়।
তবে মেসির ঘনিষ্ঠজনেরা মনে করেন, এসব কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবে রূপ নেবে না। তার বর্তমান পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র ইউরোপ ও মায়ামি। আর সমুদ্র ও বার্সেলোনা শহরের কাছাকাছি কাস্তেলদেফেলসে পরিবারের জন্য আদর্শ একটি বাড়িও রয়েছে। মেসি ও তার পরিবারের জন্য সেটিই স্থিতিশীলতার নিখুঁত জায়গা।
ক্লাবের মালিকানা মেসির প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও তরুণ ফুটবল তার আগ্রহের বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। এখানেও নেওয়েলস ওল্ড বয়েজ গুরুত্বপূর্ণ। এ বছর ‘মেসি কাপ’-এ অংশ নেওয়া ১৬টি একাডেমির একটি তারা।
শুধু নিজের নাম ব্যবহার করে এই প্রতিযোগিতা আয়োজনেই মেসির আগ্রহ সীমাবদ্ধ নয়। ছেলের ম্যাচ এবং তার চারপাশের সবকিছু অনুসরণ করতে তিনি আগ্রহী। পাশাপাশি বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোকে সময় ও অর্থ দিয়ে সহায়তাও করেন তিনি।
প্রতিযোগিতাটি শুরু হয়েছিল আটটি দল নিয়ে। গত বছর আয়োজকদের চমকে দেন মেসি। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি হয়তো একটি-দুটি ম্যাচ কিংবা শুধু ফাইনাল দেখতে আসবেন। কিন্তু পুরো প্রতিযোগিতায় উপস্থিত থেকে প্রতিটি ম্যাচ অনুসরণ করেন তিনি।
এবার প্রতিযোগিতায় দলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৬। আগামী ২৫ অক্টোবর ফ্লোরিডায় ইন্টার মায়ামির নিজস্ব মাঠে শুরু হবে খেলা।
অংশগ্রহণকারী দল ও একাডেমির তালিকায় রয়েছে আতলেতিকো মাদ্রিদ, চেলসি, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, আর্সেনাল ও ইউই কর্নেয়াসহ আরও কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠান।
মাঠের বাইরেও বিশাল বিনিয়োগের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন মেসি। এ কারণেই গত জুনে ফোর্বস সাময়িকী তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১০ কোটি মার্কিন ডলার বলে অনুমান করেছিল। আগের এক বছরে ফুটবল ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে তার বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ১৪ কোটি মার্কিন ডলার।
২০১৭ সালে স্বাক্ষর করা জার্মান ক্রীড়াসামগ্রী প্রতিষ্ঠান আদিদাসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিটি তার সবচেয়ে পরিচিত বাণিজ্যিক অংশীদারত্বগুলোর একটি। মেসির মালিকানায় রয়েছে মিম হোটেলসও। ইবিজা থেকে আন্দোররা পর্যন্ত ছয়টি বিলাসবহুল ছোট হোটেলের এই শৃঙ্খল পরিচালনা করছে মেলিয়া গোষ্ঠী। গত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া ইজারা চুক্তির আওতায় তারা হোটেলগুলো পরিচালনা করছে।
মিম নামটি মেসির নামের সঙ্গে মাজেস্টিক হোটেলস গোষ্ঠীর নাম মিলিয়ে তৈরি। মেলিয়া কালেকশন হোটেলগুলো পরিচালনা করছে। মেসির শহর রোসারিওতে তার পরিবারের প্রতিষ্ঠান কারাস্কো এম আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। পারানা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে রয়েছে ২৪টি বাড়ি।
আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার আনহেল দি মারিয়ার মালিকানাধীন একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান এগুলোর বিক্রয় পরিচালনা করছে।
রেস্তোরাঁ ব্যবসাতেও রয়েছে মেসির অংশীদারত্ব। এল ক্লুব দে লা মিলানেসা নামের রেস্তোরাঁ শৃঙ্খলে তার মালিকানা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কাতালোনিয়ায় পাঁচটি শাখা খোলার পরিকল্পনা করছে। প্রথমটি হবে কাস্তেলদেফেলসে।
আবাসন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ ছিল কেবল শুরু। দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পানীয় মাতের ব্যবসাতেও পা রেখেছেন মেসি। পানীয় রাখার পাত্র ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্যানলির সঙ্গে বিশেষ একটি সংগ্রহ বাজারে এনেছেন তিনি।
কোনো ক্রীড়াবিদের সঙ্গে স্ট্যানলির এটিই প্রথম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। সংগ্রহে ব্যবহৃত উপকরণ ও রং নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নিজে যুক্ত ছিলেন মেসি।
ব্যবসায় মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল বাবা হোর্হের সঙ্গে। শুরু থেকেই ছেলের সব বিষয় দেখভাল করতেন হোর্হে। গত আগস্টে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন ধরে মেসির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষদের একজন ছিলেন হোর্হে।
তার দেওয়া কিছু প্রাথমিক পরামর্শের কারণে স্পেনের কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও একসময় পরিবারটি সমস্যায় পড়েছিল। পরে মেসির ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় এবং আরও সুসংগঠিত ও স্থিতিশীল একটি কাঠামো তৈরি হয়।
টেলিভিশন প্রযোজনা, বিপণন, গণমাধ্যম ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের জন্য আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানও এই কাঠামোর অধীনে আসে। বাবার গুরুতর স্বাস্থ্য সংকটের আগেই এসব কর্মকাণ্ড শক্ত ভিত্তি তৈরি করে ফেলেছিল।
এখন মেসি তার ব্যবসা পরিচালনার জন্য একদল আস্থাভাজন মানুষের ওপর নির্ভর করেন। তাদের কয়েকজন বার্সেলোনায় তার শুরুর দিনগুলো থেকেই সঙ্গে আছেন। প্রতিটি বিনিয়োগের সুযোগ খুব সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হয়। মেসি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এমন সুযোগই কেবল তার কাছে পৌঁছায়। ব্যবসায়িক জগতের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেন এবং কোনো পক্ষকে নিজের পথ নির্ধারণ করতে দেন না।
তার বিশাল বিনিয়োগভাণ্ডার ও নানা ব্যবসায়িক উদ্যোগ থাকলেও নিজেকে পুরোপুরি ব্যবসায়ী মনে করেন না মেসি। গত নভেম্বরে মায়ামিতে আমেরিকা বিজনেস ফোরামে তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যবসার জগতটি আমাকে আকর্ষণ করে। আমি আরও শিখতে চাই, কারণ আমি কিছুই জানি না এবং এখনো পথচলার একেবারে শুরুতে আছি।’
পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে মেসির ভাবনাকে এই একটি বাক্যই হয়তো যেকোনো ঘোষিত পরিকল্পনার চেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে। ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুই দশকের বেশি সময় কাটিয়েও খেলা থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নন তিনি। বরং ফুটবলকে ঘিরেই নতুন একটি জগৎ গড়ে তুলতে শুরু করেছেন।
ক্লাব, তরুণ প্রতিভা, আবাসন, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বড় বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে মেসির নামের একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠছে। তবু সবকিছুর আগে তিনি এখনো একজন ফুটবলার।
তার বিনিয়োগের পরিধি বিশাল। প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে। ক্লাব মালিক হিসেবে তার অবস্থানও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। তারপরও মাঠে আরও কিছু অর্জনের তাড়না এখনো মেসির মধ্যে রয়ে গেছে।
পরবর্তী অধ্যায়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈপরীত্য এখানেই। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিংবদন্তি, নিজের সাম্রাজ্যের রূপরেখা আঁকতে থাকা এক ব্যবসায়ী, খুঁটিনাটির কাছাকাছি থাকতে চাওয়া এক ক্লাব মালিক—আর একই সঙ্গে খেলার জন্য নতুন কোনো কারণ খুঁজতে থাকা এক ফুটবলার।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির যুগ প্রায় শেষ। কিন্তু মেসির নিজের গল্প এখনো শেষ হওয়ার কাছাকাছিও আসেনি।

