ঢাকা৩১শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মিয়ানমারে পাল্টে যাচ্ছে যুদ্ধের চিত্র চাপে সামরিক জান্তা বিরোধী গোষ্ঠীগুলো

admin
আগস্ট ৩০, ২০২৬ ৫:৫৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ আগস্ট ২০২৬

মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে বড় ধরনের মোড় এসেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ধারাবাহিক সাফল্যের পর এবার একের পর এক শহর থেকে পিছু হটতে হচ্ছে সামরিক সরকারের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে। বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীর ব্যাপক নিয়োগ, শক্তিশালী বিমান হামলা এবং চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ চিন প্রদেশের সীমান্তবর্তী শহর ফালাম। গত এপ্রিলে প্রায় ছয় মাসের সামরিক অভিযানের পর শহরটি ছেড়ে দেয় বিদ্রোহী যোদ্ধারা। বিদ্রোহীদের দাবি, শেষ পর্যন্ত তাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা ফালাম থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।

সামরিক বাহিনী ওই অভিযানে শত শত বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি প্রায় এক হাজার সেনা নিয়ে স্থল অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় এক বছর বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফালাম দখল ছিল জান্তার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কারণ চিন রাজ্যের একমাত্র বিমানবন্দর এই শহরে এবং ভারত সীমান্তের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যপথও এর মধ্য দিয়ে গেছে।

ফালাম পতনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চিন প্রদেশের আরও তিনটি শহর সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। মে মাসের শেষ নাগাদ জান্তা উত্তর চিনের পুরো অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে।

বিদ্রোহী চিন ব্রাদারহুডের সদস্য সালাই উইলিয়াম চিন বলেন, ফালামের অভিজ্ঞতা তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। কোনো শহর দখল করা এবং দীর্ঘ সময় সেটি ধরে রাখা-দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি শহর ধরে রাখতে জনবল, রসদ, প্রশাসন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং বিশেষ করে বারবার বিমান হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা প্রয়োজন।

একের পর এক শহর পুনর্দখল

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারে সংঘাত চলছে। নির্বাচিত সরকার উৎখাতের পর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হলে তরুণদের একটি অংশ অস্ত্র হাতে নেয়। পরে তারা পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস বা পিডিএফ নামে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। এসব সংগঠনের কয়েকটি ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করে আসছে।

২০২৩ ও ২০২৪ সালে সমন্বিত অভিযানে বিদ্রোহীরা সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কয়েক ডজন শহর দখল করে নেয়। কিন্তু এখন সেই অগ্রযাত্রার বিপরীতে শহরাঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে পিছু হটছে বিরোধী বাহিনী।

স্বাধীন থিংকট্যাংক আইএসপি-মিয়ানমার-এর তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনী যে ১০১টি শহর হারিয়েছিল, তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ২২টি পুনর্দখল করেছে। সংখ্যার হিসাবে এটি হারানো শহরের প্রায় ২২ শতাংশ। তবে এসব শহরের নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও সীমান্ত এলাকার ওপর আবারও প্রভাব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়েছে।

এসিএলইডি-এর বিশ্লেষক সু মন বলেন, এসব শহর পুনর্দখলের ফলে অনেক প্রতিরোধ গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও রসদ সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে বিরোধীরা বড় আকারের সমন্বিত অভিযান থেকে সরে গিয়ে প্রতিরক্ষামূলক গেরিলা যুদ্ধে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

তবে সামরিক বাহিনী বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘চূড়ান্ত’ বা রাজনৈতিকভাবে নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করতে পারবে এমন সম্ভাবনা কম বলেও মনে করেন তিনি।

সেনাবাহিনীর শক্তি বাড়িয়েছে বাধ্যতামূলক নিয়োগ

ব্যাংককভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের মতে, সামরিক বাহিনীর ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ও চীনের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে বাধ্যতামূলক নিয়োগের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর যোদ্ধা সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বেড়েছে। এসব নতুন সদস্যের অনেকের প্রশিক্ষণ সীমিত হলেও বিপুল সংখ্যক সেনা সামরিক বাহিনীকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

চীনের চাপও বিদ্রোহীদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছে। বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)-এর মতো শক্তিশালী দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সংঘাত থেকে সরে গেছে। এতে সামরিক বাহিনী অন্য ফ্রন্টে সেনা মোতায়েনের সুযোগ পেয়েছে।

এ ছাড়া চীন ইউনাইটেড ওয় স্টেট আর্মির ওপরও চাপ প্রয়োগ করেছে, যাতে তারা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে। এর ফলে দেশজুড়ে বিদ্রোহীদের গোলাবারুদের সংকট আরও বেড়েছে।

বিমান হামলায় বিপর্যস্ত বেসামরিক মানুষ

যুদ্ধক্ষেত্রে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো বিমান শক্তি। বিশ্লেষক ডেভিসের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকেই আকাশপথে সামরিক বাহিনীর উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। সেনা ও রসদ সরবরাহের পাশাপাশি বিদ্রোহী অবস্থানে হামলা চালাতেও বিমান শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর সঙ্গে ড্রোনের ব্যবহার এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে উন্নত সমন্বয় তাদের যুদ্ধক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে।

তবে বিমান হামলার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মিয়ানমার ইন্টারনেট প্রজেক্টের হিসাবে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে ৫২০টি বিমান হামলা হয়েছে। এসব হামলা ৮৭টি টাউনশিপে আঘাত হানে এবং অন্তত ৩১৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪১ শিশু রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে চিন প্রদেশ। সেখানে ১২২টি বিমান হামলা হয়েছে। এরপর সাগাইংয়ে ১০১টি এবং রাখাইনে ৯৮টি হামলা চালানো হয়েছে।

এশিয়া হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার অ্যাডভোকেটসের পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, সামরিক বাহিনীর বিমান আধিপত্য মোকাবিলা করতে না পারা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর লড়াইয়ের সক্ষমতা ও মনোবল দুর্বল করেছে। বিমান হামলা পিডিএফ ও অন্যান্য প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী বেসামরিক মানুষদেরও ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে।

তবু লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক সাফল্য সত্ত্বেও বিরোধীরা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে বলে মানতে নারাজ। নির্বাসনে থাকা অ্যাক্টিভিস্ট থিনজার শুনলেই ই বলেন, ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যেও বিরোধী নেটওয়ার্কগুলো সংগঠকদের প্রশিক্ষণ ও জনসমর্থন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

চিনের বিদ্রোহী নেতা সালাই উইলিয়াম চিনও ভবিষ্যৎ লড়াই নিয়ে আশাবাদী। তার ভাষায়, বিমান শক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের ভাগ্য স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে এমনটা বলা যায় না। বিমান হামলা অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ, তবে যুদ্ধের ধরনও বদলাচ্ছে এবং প্রতিরোধ বাহিনীগুলোও নিজেদের কৌশল পরিবর্তন ও মানিয়ে নিতে শিখছে।

তার মতে, বিরোধীদের সাফল্য শুধু তারা কোনো শহর দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারছে কি না, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। সামরিক বাহিনীর যেখানে বিমান শক্তিতে বড় সুবিধা রয়েছে, সেখানে মোবাইল যুদ্ধকৌশল বেশি কার্যকর হতে পারে।

এখন প্রতিরোধ বাহিনীগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিজেদের শক্তি ধরে রাখা, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।