ঢাকা২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে সচেতনতা বৃদ্ধি করা খুব জরুরি

admin
ডিসেম্বর ৭, ২০২৪ ১২:০৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাচ্ছে। সে হিসেবে ৬৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী মানুষদের প্রবীণ জনগোষ্ঠীভুক্ত বিবেচনা করা হয়। বিজ্ঞান ও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের সব দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আজ যে শিশুটি মায়ের কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করল, একদিন সে প্রবীণ হবে, এটি শুধু সময়ের ব্যাপার। নতুন শিশুটির মতো প্রবীণদের জন্য সমাজ অনেক দায়িত্ব পালন করতে পারে, পালন করা দরকারও।

মনে রাখতে হবে, আবার আজ যিনি প্রবীণ তিনি সমাজকে অনেক কিছু দিয়ে এই অবস্থায় এসেছেন। তার মনন, মেধা ও কর্মদক্ষতাকে সমাজের উন্নয়নের কাজে প্রয়োগ করেছেন। আমরা আজ যে আধুনিক সমাজে বসবাস করছি তা কিন্তু প্রবীণদেরই অবদান। এখন ভাবার সময় হয়েছে, আমরা কি তাদের সেই কর্মযজ্ঞের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারছি? কোনো প্রবীণ কি আমাদের সমাজে অবহেলিত হচ্ছেন? প্রবীণ ব্যক্তির অনেক সমস্যার মধ্যে একটি হলো স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের নানারকম রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, আক্রান্তও হন নানা অসুস্থতায়। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক ইত্যাদি। এগুলো অসংক্রামক রোগ। তবে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে যদি এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায় তা হলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। হতে পারে কিডনিজনিত সমস্যা, পক্ষাঘাত, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া কিংবা একেবারেই দৃষ্টিশক্তি হারানো, এমনকি হার্ট ফেইলিউর হওয়ার আশঙ্কাও কিন্তু কম নয়।

শুধু অসংক্রামক রোগই নয়, প্রবীণদের ক্ষেত্রে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এটা হতে পারে ফ্লু, নিউমোনিয়া এবং প্রস্রাবের সমস্যা। এসব সমস্যা প্রবীণদের নানাভাবে কষ্ট দেয়। তবে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে এসব অসুস্থতা জটিলতামুক্ত থাকে।

প্রতিদিন সকালে আমরা যখন কর্মস্থলের দিকে যাত্রা করি তখন বেশ কিছু বৃদ্ধ ভিক্ষুক আমাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। প্রতিটি সিগন্যালে তারা হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে অসহায়ভাবে। আমরা কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে কিছু কিছু দান করে থাকি। তাতে আমরা সাময়িক পরিতৃপ্তি লাভ করি। কিন্তু এটি কখনই স্থায়ী সমাধান নয়। প্রবীণদের জন্য আমাদের আরও অনেক কিছু করার আছে। এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন তাদের কখনও কারও ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবনযাপন করতে না হয়।

আমরা জানি, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের সমস্যা হয়, হতে পারে শ্রবণশক্তি হ্রাসও। এ সময় তারা অন্যের কথা ঠিকভাবে শুনতে পান না আবার তাদের কথাও কেউ শুনতে চায় না। এটি তাদের জন্য সত্যিই মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রবীণদের ভালো রাখতে হবে, দিনের কিছুটা সময় তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, হাসি-আনন্দে ভরিয়ে রাখতে হবে এবং তাদের অভিজ্ঞতাপ্রসূত কথাও শুনতে হবে। তাতে আমাদের নতুন প্রজন্ম সমৃদ্ধ হবে।

প্রবীণরা যেন একসঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে, তাদের জন্য এলাকাভিত্তিক ক্লাব কিংবা রেস্তোরাঁও হতে পারে। প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও খেয়াল রাখতে হবে। তাদের মন ভালো থাকলে শরীরও ভালো থাকবে। আজকাল স্মৃতিভ্রংশের বিষয়টি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশির ভাগ প্রবীণ ব্যক্তিই ভুলে যাওয়ার সমস্যায় ভুগতে পারেন। অনেক সময় ওষুধ খেতে ভুলে যান অথবা একই ওষুধ দুবার খেয়ে নেন। তাদের এই ভুলে যাওয়ার জন্য তারা দায়ী নন, এজন্য রাগ করা যাবে না কিংবা বিরক্ত হওয়াও যাবে না। এ ক্ষেত্রে তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে। বাইরে যাওয়ার সময় যদি কেউ সঙ্গে না থাকে তা হলে পকেটে বা ব্যাগে বাড়ির ঠিকানা এবং ফোন নম্বর লিখে রেখে দেওয়া উচিত। সময়মতো এবং সঠিকভাবে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য যদি কেউ না থাকে তা হলে ‘মেডিসিন বক্স’ কিনে তার মধ্যে সাত দিনের ওষুধ প্রতিবেলার জন্য নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে। তাতে আর ভুল হবে না, সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধ গ্রহণ করা যাবে।

আমাদের তিলোত্তমা ঢাকার পার্কগুলোর একটি নির্দিষ্ট কর্নার রাখতে হবে প্রবীণদের জন্য। সকালে ও বিকালে হাঁটার জন্য পার্কে প্রবীণদের জন্য আলাদা ‘ওয়াকওয়ে’ রাখা দরকার। কারণ এ সময় তারা ভারসাম্যহীনতার কারণে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। পড়ে গেলে মাথায় আঘাত পেতে পারেন বা হাড় ফ্র্যাকচার হতে পারে। একবার এ ধরনের সমস্যা হলে তা থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই প্রবীণরা নিজস্ব ওয়াকওয়েতে হাঁটলে এ ধরনের সমস্যা হওয়ার শঙ্কা অনেকটাই কমে যায়।

একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হতে পারে, এজন্য খাবার-দাবার যেন সঠিক হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ সময় অনেকের দাঁতে সমস্যা হতে পারে, ফলে খাবার গ্রহণে অসুবিধা হয়। খাবারে রুচি কমে যেতেও পারে। তাই প্রায়ই পুষ্টির ঘাটতি হয়। এজন্য প্রবীণদের জন্য বিশেষ ধরনের খাদ্য দরকার। প্রতিদিনের খাবারে সুষম পুষ্টি আছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। খাবারে থাকতে হবে পর্যাপ্ত আমিষ, শর্করা, ভালো চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ লবণ। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, খাবার যেন সহজপাচ্য হয়।

প্রবীণরা যেন স্বল্প খরচে এবং সহজে চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন সেজন্য হেলথ কার্ড চালু করা যায়। অন্যদের চেয়ে কম সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাক্ষাতের সুযোগ করে দিতে হবে। সব হাসপাতালে দরকার ‘প্রবীণ জরুরি বিভাগ’। চিকিৎসাকেন্দ্রে গেলে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করার জন্য স্মার্ট ও হাস্যোজ্জ্বল কিছু প্রশিক্ষিত সহায়তাকারী থাকা দরকার।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যেন হাই কমোডযুক্ত টয়লেট থাকে সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে।

যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাহনে প্রবীণদের আলাদা কোনো আসন বরাদ্দ নেই, নেই আলাদা টিকিট কাটার ব্যবস্থা। তাদের এসব সমস্যা থেকে মুক্ত করার জন্য পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি বাহনেই রাখতে হবে ‘প্রবীণ আসন’। লিফটে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে করতে হবে।

অনেক প্রবীণ ব্যক্তি খিটখিটে হয়ে পড়েন বা বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। কখনও কারণে-অকারণে আক্রমণাত্মক হয়ে পড়তে পারেন। নিজের কাজ নিজে করতে না পারার জন্য লজ্জিত হয়ে পড়েন। এজন্য পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি সামলে নিতে পারেন। তা ছাড়া আজকাল ‘কেয়ার গিভার’ দিয়েও অনেকভাবে প্রবীণ ব্যক্তিদের সহযোগিতা করা যায়।

মনে রাখতে হবে, সমাজ এখন রূপান্তরকামী, সবকিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পরিবার তাকে আর আগের মতো সময় দিতে পারছে না। চাইলেও নিজের ইচ্ছেমতো বাইরে যেতে পারছেন না। সন্তান-সন্ততি কিংবা অন্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় মনে হতাশা ভর করে।

তা ছাড়া চাকরি বা ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়া ব্যক্তিটি ভাবেন, পরিবারে তার গুরুত্ব কমছে। এ সময় তিনি চরম নিঃসঙ্গতা ও হতাশায় ভোগেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব তো আছেই।

দেশের প্রতিজন প্রবীণের জন্য বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা রাখা যায়, তা হলে আমাদের দেশের কোনো প্রবীণই কারও মুখাপেক্ষী হবেন না। আমাদের তিলোত্তমা নগরী ঢাকার পথে-প্রান্তরে কারও সামনে আর কোনো প্রবীণের হাত ভিক্ষার জন্য প্রসারিত হবে না। প্রবীণদের মুখে থাকবে সম্মানসূচক হাসি।

ঢাকার সিগন্যালগুলো হয়ে উঠুক বয়স্ক ভিক্ষুকমুক্ত, এমন প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। আমরা চাই আমাদের প্রাণের শহরে যেন কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা অর্থকষ্টে পথে নেমে না আসেন। আমাদের ঢাকা হোক প্রকৃতপক্ষেই সুন্দর ঢাকা।

মনে রাখা দরকার, সবার আগে পরিবার হতে হবে প্রবীণবান্ধব। পরিবার ও পরিবেশ যদি প্রবীণবান্ধব না হয় তা হলে সমাজে অনিয়ম চলে আসে এবং এই অনিয়ম ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে।

সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া বার্ধক্যকে আমরা রোধ করতে পারি না কিন্তু একটি সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমরা স্বাস্থ্যকে সহনশীল মাত্রায় বেঁধে রাখতে পারি। এজন্য প্রয়োজন, প্রবীণ ব্যক্তি, তার পরিবার, সমাজ কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবীণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে সচেতনতা বৃদ্ধি করা খুব জরুরি, আর এজন্য এগিয়ে আসতে হবে তরুণদের। তরুণরাই পারে সমাজের সব ধরনের সমস্যা সবার সামনে তুলে ধরতে এবং একই সঙ্গে এর সমাধান করতেও।

তরুণরা যদি উপলব্ধি করতে পারে তারাও একদিন প্রবীণ হবে। তবেই তাদের পক্ষে প্রবীণবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার মাধ্যমে মূলত নিজেদের ভালো থাকার ব্যবস্থাই হয়ে যায়।

তা ছাড়া প্রবীণদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাতেও হয়। তাদের দিনগুলো হাসি-আনন্দে ভরিয়ে তুলতে হবে।

তাই আজ নয়, এখন থেকেই শুরু হোক একটি সুন্দর ও শান্তিময় প্রবীণবান্ধব পরিবার, সমাজ এবং শহর গড়ে তোলার একান্ত প্রচেষ্টা।

শেলী সেনগুপ্তা : কবি ও কথাসাহিত্যিক

প্রবীণবান্ধব

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।