ঢাকা২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সড়ক দুর্ঘটনায় বিবেক এখন আর কাঁদে না?

admin
জানুয়ারি ৪, ২০২৫ ৪:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বর্তমানে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিদিন টিভির স্ক্রলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন মানুষের মৃত্যুর খবর দেখেও আমাদের বিবেক আর সাড়া দেয় না, আমরা ব্যথিত হই না, আমরা এর প্রতিকার নিয়ে ভাবি না। কারণ চারপাশে এত মৃত্যুর মিছিলে আমাদের বিবেকবোধ একেবারেই ভোঁতা হয়ে গেছে। সবকিছুই আমরা স্বাভাবিকভাবে দেখছি। যদিও ফিল্ম মেকার তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মতো কিছু প্রোথিতযশা মিডিয়া কর্মী এবং রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় বাসচাপায় নিহত হন শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব এবং একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিমের মৃত্যুতে কিছু আলোচনাসভা, কিছু টকশো, আন্দোলনও হয়েছিল বটে; তবে বাস্তবিক অর্থে এর স্থায়ী সমাধানের কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

বাংলাদেশের যে কয়টি মহাসড়কে সব চেয়ে মর্মান্তিক এবং ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে তার মধ্যে টাঙ্গাইল-সিরাজগঞ্জ মহাসড়ক ছিল অন্যতম। আর হবেই বা না কেন? গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে উত্তরবঙ্গের ১৯টি জেলায় যেতে তখন টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, যমুনার বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ২ লেনের রাস্তা অতিক্রম করতে হয়েছে। আর এই ১৯ জেলার সব পণ্যবাহী ট্রাকসহ যাত্রীবাহী বাসের বিপরীতমুখী গমনাগমনের ফলে এমন ধরনের দুর্ঘটনা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। ২ যুগের অধিককাল ধরে যমুনা সেতু চালু হয়েছে, অথচ সেতুর দুই পাশের এলেঙ্গা (সেতুর পূর্বপার) হতে হাটিকুমরুল (সেতুর পশ্চিমপার) পর্যন্ত সংযোগ সড়কটা ছিল ২ লেনের, যা শুরুতেই ৪ লেনের হওয়া উচিত ছিল। অনেক দেরিতে হলেও দেশের কর্তাব্যক্তিরা এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছেন, এজন্য ধন্যবাদ। বর্তমানে উক্ত সড়কটি ৪ লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান। যদিও বিগত সরকার বার বার বলে এসেছেÑ রাজধানী থেকে যাওয়া সব মহা সড়ক চার লেনে উন্নিত করা হবে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দুটি ৪ লেনে উন্নীত করা হয়েছে। অপরদিকে দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদারখ্যাত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কটি ৮ লেনে উন্নীত করা হয়েছে, যা পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। এই ৮ লেনের রাস্তাটি কেবল ভাঙ্গাতেই শেষ হয়েছে, ফলে ভাঙ্গা থেকে যশোর-খুলনা, ভাঙ্গা-বরিশাল এবং ভাঙ্গা-ফরিদপুর মহাসড়কগুলো আগের মতোই ২ লেনে থাকায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপে তা ঢাকা-টাঙ্গাইল-সিরাজগঞ্জ মহাসড়কের মতোই মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই সড়কগুলোতে সংঘটিত দুর্ঘটনা প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। শত শত মানুষ জীবন হারাচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব হচ্ছে। কিন্ত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক- সড়ক দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যু। যে কোনো মৃত্যুই অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক; কিন্তু এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? গাড়ির চালক, পথচারী সাধারণ জনগণ, নাকি সরকারের সংসিøষ্ট কর্তাব্যক্তিরা?

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০-২৫ জন লোক মারা যাচ্ছে। পুলিশের দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০-এর অধিক এবং আহত হয়েছে ৯ হাজারের অধিক মানুষ। আরেক হিসাবে বলা হয়েছেÑ গত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২ লাখের বেশি মানুষ। বিআরটিএ-এর হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ৬০০০-এর মতো দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, যাতে ৬-৭ হাজারের অধিক মানুষ মারা যায়, ৫০ থেকে ৬০ হাজারের মতো মানুষ আহত হয়ে সম্পূর্ণ/আংশিক পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। এদের পরিবারে ওপর নেমে এসেছে এক অসহায়ত্ব এবং অমানিশার অন্ধকার। অপরদিকে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, এসব দুর্ঘটনার ফলে বছরে দেশের আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনা কমাতে কিংবা নিহত-আহতদের ক্ষতিপূরণ/পুনর্বাসন কল্পে সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ কোথাও দেখা যায়নি। যদিও নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে মাঝেমধ্যে সভা-সেমিনার হয়, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে; কিন্তু এতে কার্যকর কোনো উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে দেশের অশিক্ষিত, অপ্রশিক্ষিত এবং অদক্ষ চালকদের অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা এবং অবহেলার কাছেই দেশের ১৮ কোটি মানুষকে অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে।

সমগ্র বাংলাদেশে রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে সড়ক যোগাযোগ মাধ্যমটাই মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে। ফলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শহর এবং বন্দরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে (সড়ক বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে অধীন), যার মধ্যে ৫০ শতাংশ সড়কই সংস্কারের অভাবে দ্রুত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া অত্যধিক সংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন গতির মোটরযানের সীমাহীন চাপে বিদ্যমান রাস্তা আরও দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। দেশের একমুখী এই যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এবং বাইসাইকেল, রিকশা, অটোরিকশা (সিএনজি), মোটরসাইকেল, প্রাইভেট গাড়িসহ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ছোট-বড় বাস এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বহনকারী প্রিয় ট্রাকের গমনাগমনের ফলে সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় যানজট। বিআরটিএর ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে মোট মোটরযানের সংখ্যা ৫৯ লাখ ৮২ হাজার ৭৬৫টি। আর বৈধ লাইসেন্স আছে ৫৯ লাখ ৪৬ হাজারের কাছাকছি; কিন্তু এই পরিসংখ্যানের বাইরে লাইসেন্সবিহীন মোটরযান যে কী পরিমাণ আছে তার হিসাব কেউই বলতে পারে না। আর অবৈধ লাইসেন্সের কথাতো আর বললামই না। তবে মোটরশ্রমিক ফেডারেশনের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের ৩২ লাখ সদস্য রয়েছে। আর এই ৩২ লাখ চালকের কারোরই মোটর ড্রাইভিংয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। এদের অধিকাংশই গাড়ির গ্যারেজে কাজ করতে করতে চালক হয়েছে, আবার কেউ কেউ গাড়ির চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করতে করতে চালক হয়েছে। এদের ভাষায়Ñ তারা ওস্তাদের কাছ থেকে গাড়ি চালাতে শিখেছে। তার মানে হলোÑ ওই ৩২ লাখ অশিক্ষিত ও ওস্তাদ চালকদের ওপর সমগ্র জাতির আজ অসহায় আত্মসমর্পণ। ফলে এই অদক্ষ চালকদের অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা এবং অসচেতনতার কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। দেশে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনার মধ্যে প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপÑ

১। অপ্রশস্ত রাস্তা এবং শোল্ডার, যেখানে পর্যাপ্ত পার্কিং-সুবিধা নেই।

২। যানবাহনের গতির তারতম্য (ধীর গতি থেকে দ্রুতগতির গাড়ি এবং ইঞ্জিনবিহীন যানবাহন)।

৩। গাড়িচালকদের ড্রাইভিংয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের অভাব এবং অদক্ষতা।

৪। সাধারণ পথচারীর অজ্ঞতা এবং ট্রাফিক আইন না মেনে চলা (অসুভ প্রতিযোগিতা)।

৫। রাস্তায় চলার অনুপোযোগী যানবাহন/গাড়ি (ফিটনেস বিহীন গাড়ি)।

৬। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদাসীনতা এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার না করা।

৭। দেশের রাস্তার তুলনায় অধিক সংখ্যক মোটরযান চলাচল।

৮। গাড়ি চালনার সময় মোবাইলে কথা বলা।

এ ধরনের আরও অনেক কারণ হয়তো বের করা যাবে, যার জন্য দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। তবে উল্লেখিত সমস্যাগুলো অন্তত যদি আমরা সমাধানে তৎপর-যত্নবান হই, তা হলে এই দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে অপর্যাপ্ত রাস্তার কারণে নতুন নতুন গাড়ি রাস্তায় নামার ব্যপারে লাইসেন্স সীমিত করা, রাস্তায় চলার অনুপোযোগী যানবাহনগুলো জব্দ করে দণ্ড দেওয়া, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় শাস্তির ব্যবস্থা করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন এবং যত্নবান হওয়া, সাধারণ জনগণকে ট্রাফিক নিয়ম এবং রাস্তায় চলাচলের বিষয়ে সচেতন করা, সর্বোপরি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গণসচেতনতা তৈরি করার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে।

মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ে গাড়ির ইঞ্জিনসহ নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের ওপর একটি বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তভুক্ত করা। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে গাড়ির চালকদের ড্রাইভিংয়ের ওপর এবং ট্রাফিক নিয়মাবলি সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণের জন্য দেশের প্রতিটি জেলাশহরে ‘বিআরটিএ’-এর সঙ্গে ট্রেনিং প্রতিষ্ঠান তৈরি করে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে এবং একই সঙ্গে তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা যেতে পারে। এতে দুর্নীতি কমাসহ দেশে দক্ষ ড্রাইভার তৈরি হবে, যা দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হবে। এমনকি ড্রাইভিং পেশায় দক্ষ শ্রমিক হিসেবে তারা বিদেশেও যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে দুঃখের বিষয় হলোÑ সরকারের এ নিয়ে ভাববার হয়ত সময় নেই অথবা সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাইতো যে কোনো দুর্ঘটনার পর পরই ওটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়; কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বস্তুত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

আশা করি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতঃ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অবিলম্বে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। একই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আহ্বান করব- আপনারাও এগিয়ে আসুন, বেসরকারি ইউনিভার্সিটির মতো ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করুন; গড়ে তুলুন দক্ষ চালক, উদ্ধার করুন দেশ তথা সাধারণ মানুষকে এই ভয়াবহ অসহায়ত্ব থেকে।

মো. ইলিয়াস হোসেন : প্রকৌশলী এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।