বাসে বসে জানালা দিয়ে কেনা আমড়া, শসা কিংবা পেয়ারা মাখা; বিকেলে পথের ধারের ঝালমুড়ি, ছোলা বা ভাজাপোড়া; কিংবা অফিসের নিচে আড্ডার ফাঁকে গরম শিঙাড়া, পুরি ও পিঠা—আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বেশ চেনা চিত্র। তবে স্বাদের এই খাবারের সঙ্গেই অজান্তে শরীরে ঢোকার সুযোগ করে নিচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। রাস্তার ধারের এসব খাবার সাধারণত দেওয়া হয় কাগজের ঠোঙা, পুরোনো পত্রিকার পাতা কিংবা সাধারণ ছাপানো কাগজে। সহজ ও সাশ্রয়ী মনে হলেও এই অভ্যাস ডেকে আনছে মারাত্মক বিপদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা বা ছাপানো কাগজে খাবার পরিবেশন করলে কাগজের ক্ষতিকর কালি ও জমে থাকা জীবাণু সরাসরি খাবারের সঙ্গে মিশে যায়। বিশেষ করে গরম, তেলযুক্ত কিংবা ভেজা খাবারের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
কাগজের ঠোঙায় খাবার কতটা ঝুঁকিপূর্ণ
রাস্তার পাশে খাবারের দোকান বা ফেরিওয়ালাদের অনেক সময় পত্রিকার পাতা, সাধারণ কাগজ কিংবা কাগজের ঠোঙায় খাবার দিতে দেখা যায়। আচার, আমড়া, শসা, ঝালমুড়ি, ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনি, ফুচকা, শিঙাড়া, পুরি, জিলাপি, পরোটা কিংবা লুচির মতো খাবার এসব কাগজে পরিবেশন করা হয়।
অনেক সময় খাবারের বাড়তি তেল শুষে নেওয়া কিংবা চামচের বিকল্প হিসেবেও কাগজ ব্যবহার করা হয়। এতে কাগজের কালি খাবারের সংস্পর্শে আসার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে কাগজে পানি বা তেল লাগলে কালির কিছু উপাদান খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
কালির ক্ষতিকর উপাদান খাবারে মিশতে পারে
কাগজের ছাপার কালিতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। এসব উপাদান খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর মধ্যে কিডনি ও লিভারের প্রদাহ, হৃদ্রোগ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা এবং প্রজননসংক্রান্ত জটিলতার মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকলে খাদ্যনালী, পাকস্থলী, বৃহদান্তর ও লিভারের মতো অঙ্গের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
গরম ও তেলযুক্ত খাবারে ঝুঁকি বেশি
শিঙাড়া, সমুচা, পুরি, পরোটা বা ভাজাপোড়ার মতো গরম ও তেলযুক্ত খাবার কাগজে রাখলে কাগজের কালি খাবারের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ বাড়ে। একইভাবে শসা, আমড়া বা আচারের মতো ভেজা খাবারও কাগজের কালি ও অন্যান্য উপাদানের সংস্পর্শে আসে। তেল ও পানি কাগজের কিছু রাসায়নিক উপাদান খাবারের দিকে স্থানান্তরে সহায়তা করতে পারে। ফলে কাগজে রাখা খাবার খাওয়ার সময় অজান্তেই এসব উপাদান শরীরে ঢুকে যেতে পারে।
পুরোনো কাগজে থাকতে পারে জীবাণু
শুধু কালিই নয়, অপরিষ্কার বা পুরোনো কাগজেও বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু থাকতে পারে। এমন কাগজ খাবারের সংস্পর্শে এলে জীবাণু খাবারে চলে আসার আশঙ্কা থাকে। পরে সেই খাবার খেলে পাকস্থলী ও অন্ত্রে প্রদাহ, হজমের সমস্যা এবং অন্যান্য পেটের অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। তাই খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে কাগজের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যারা প্রায় প্রতিদিনই কাজের প্রয়োজনে বা অভ্যাসের বশে বাইরের খাবারে ভরসা করেন এবং পত্রিকার পাতায় মোড়ানো খাবার খান, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অল্প পরিমাণে হলেও নিয়মিত শরীরে জমা হওয়া এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ব্যাধির রূপ নেয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সমাধান
চিকিৎসকদের মতে, খাবারের জন্য কাগজের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, তবে নিরাপদ ও ‘ফুড গ্রেড’ কাগজের নিশ্চিত ব্যবহার জরুরি।
১. সাধারণ ছাপানো কাগজ, ক্যালিগ্রাফি বা হাতে লেখা কাগজ এবং বিশেষ করে পত্রিকার পাতায় খাবার খাওয়া পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে।
২. খাবার পরিবেশনে পরিষ্কার ফুড-গ্রেড সাদা কাগজ, সাধারণ টিস্যু বা পেপার টাওয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. রঙিন টিস্যু এড়িয়ে চলাই শ্রেয়, কারণ রঙিন টিস্যুর ডাই-ও খাবারে মিশতে পারে।
৪. গরম, তেলযুক্ত ও ভেজা খাবারের ক্ষেত্রে সাধারণ কাগজের বিকল্প হিসেবে পরিচ্ছন্ন প্লেট বা কাচের পাত্র বেছে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
রাস্তার খাবার খাওয়ার সময় খাবারটি কতটা সুস্বাদু তা দেখার পাশাপাশি কোন পাত্র বা কাগজে সেটি পরিবেশন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। একটি ছোট সচেতনতাই বাঁচাতে পারে বড় কোনো শারীরিক বিপর্যয় থেকে।

