অনলাইন ডেক্স:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডিজিটাল প্রযুক্তি আর সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে ছবি তোলা এখন আর কেবল বিশেষ কোনো মুহূর্তকে ফ্রেমে বন্দি করার মাধ্যম নয়; বরং এটি রূপ নিয়েছে দৈনন্দিন জীবনের ফ্যাশন ট্রেন্ডে। একসময় স্টুডিওতে গিয়ে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ক্যামেরা ধার করে ছবি তোলার চল ছিল। এখন তা অনেক সহজ। ছবি তোলা নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার শিল্প এবং বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেন্ড। এই ট্রেন্ড নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন নিশাত তানিয়া
ধরা যাক শাপলা-কাশফুলের মৌসুমে ছবির খোঁজে একটা ভ্রমণ হয় না এমন মানুষ কমই পাওয়া যায়। শরৎ এলেই প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে কাশফুলের দোলা আর জলাভূমিতে ফুটে থাকা শাপলা— সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতি হয়ে ওঠে এক অন্যরকম সুন্দর। আর এই সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন সংস্কৃতি— ছবি তোলা। বন্ধুদের দল, ব্যাচমেট, সহকর্মী কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একই রঙের পোশাক পরে প্রকৃতির মাঝে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা যেন শরৎকালের অন্যতম ট্রেন্ড। বিশেষ করে শাপলা ও কাশফুলের মৌসুমে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান হয়ে ওঠে ছবি তোলার জনপ্রিয় স্পট। কেউ শাড়ি পরে, কেউ পাঞ্জাবি, কেউ বা একই রঙের টি-শার্ট পরে দলবেঁধে ছুটছেন। অনেকের কাছে ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে স্মৃতি ধরে রাখার সুযোগ। আর সেই স্মৃতি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নেওয়াই যেন ভ্রমণের একটি অংশ। তবে এই ট্রেন্ডি ছবি কে আরও সুন্দর করে পোশাকটা তো অবশ্যই বড় ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী বিপ্লব সাহা। তিনি মনে করেন, এখন নিজেদের মধ্যে গ্রুমিং ব্যাপারটা আছে, তাই সুন্দর একটা পোশাক পরে সবাই নিজেকে মডেল মনে করে। ফুলের সঙ্গে কী জামা, সমুদ্রের ধারে কী শাড়ি, সূর্যস্তের সঙ্গে কী রঙ— সবই মিলিয়ে সবাই একটা সুন্দর ছবি তুলে ইদানীং। এখন সবকিছু বেশ সহজলভ্য হওয়ায় বিভিন্ন হাউসের ছবিগুলোও সবাই দেখতে পায়, সেটাও অনেকে ফলো করে ছবি তোলে বলে মনে করেন তিনি। শাপলা দেখতে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত জায়গাগুলোর একটি বরিশালের সাতলা। বর্ষা ও শরতের শুরুতে এখানকার বিস্তীর্ণ জলাভূমি লাল-সাদা শাপলায় ভরে ওঠে। নৌকায় করে শাপলার মাঝ দিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে ছবি তোলার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই বিশেষ আকর্ষণ। শরৎ মানেই কাশফুল। নদীর পাড়, চরাঞ্চল কিংবা খোলা মাঠে সাদা কাশফুলের সারি এখন ছবি তোলার অন্যতম প্রিয় পটভূমি। ঢাকার আশপাশে দিয়াবাড়ী ও তুরাগ নদীর তীরের বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমে কাশফুল দেখতে ভিড় করেন অনেকে। বিশেষ করে বিকালের নরম আলোয় কাশবনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। এখন প্রায় চোখে পড়ে একই পোশাকে বন্ধুদের দল শুধু প্রকৃতি নয়, এখন ভ্রমণের পরিকল্পনাতেও পোশাক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনেকটা ছবির কারণেই। বন্ধুদের একটি দল একই রঙের পোশাক পরে ছবি তুলছে, ব্যাচমেটরা ঠিক করে নিচ্ছে নির্দিষ্ট ড্রেস কোড, আবার কোনো পরিবার বাবা-মা ও সন্তানদের জন্য বেছে নিচ্ছে একই রঙ বা একই ধরনের পোশাক। দলীয় ছবিতে পোশাকের এই মিল ছবিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ফলে ভ্রমণের আগে ‘কোথায় যাব’ প্রশ্নের সঙ্গে যোগ হচ্ছে ‘কী পরব’— এই প্রশ্নটিও। কোনো একটা পছন্দের সিনেমায় দেখা দৃশ্যের স্থানে গেলে একইভাবে নিজেদের ছবি তোলাটা এখন ট্রেন্ড। সেটা দেশ হোক বা বিদেশ। শুধু ছবি নয়, অনেকে তো একই স্থানে ঠিক নায়ক-নায়িকার আদলে করছেন ভিডিও। এখন তো অনেক রেস্তোরাঁ সেভাবেই সাজানো হচ্ছে, যেখানে খাবারের পাশাপাশি ছবি তোলাটাও উপভোগ করা যায়। সেখানে থাকছে ছবি তোলার একটা আলদা জায়গাই। কোনো রেস্তোরাঁ মহাকাশ তো কোনোটা গুহা, আবার কোনোটা সমুদ্রের তলদেশ। এসবই আকৃষ্ট করছে ছবি তোলাকে। এ ছবি সামাজিকমাধ্যমের দ্বারা স্থানেরও এক ধরনের প্রচারও হচ্ছে। শুধু বড় জায়গায় না একটা ফুড কার্ডও সাজানো হচ্ছে দারুন সব থিমে। আর সেসব থিমের সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম পরে যাচ্ছে পোশাকও। শুধু নিজের ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, হয়তো শুধু হাতের, ব্যাগের, কোনো অর্নামেন্টেসের ছবি তোলাটাও ট্রেন্ড।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ছবি তোলা নিঃসন্দেহে ভ্রমণের আনন্দের একটি অংশ। তবে ছবি তুলতে গিয়ে যেন প্রকৃতির ক্ষতি না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কাশফুলের গাছ নষ্ট করা, শাপলা ছিঁড়ে ফেলা কিংবা প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট ফেলে আসা কোনোভাবেই ভ্রমণের সৌন্দর্যের সঙ্গে যায় না।
শাপলা বা কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রতিও সম্মান দেখানো প্রয়োজন। নৌকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় গাইড বা নৌকার মাঝিদের পরামর্শ মেনে চলাও জরুরি। এবার আসা যাক ঘরোয়া আয়োজনে। বেশির ভাগ অনুষ্ঠানেই এখন একটা ড্রেস কোর্ড না থাকলেও পারতপক্ষে কালার কোর্ড থাকছেই, সেটার কারণ অনেকটাই এই ছবি ট্রেন্ডের জন্যই। ভালোও লাগে দেখতে। আগে এটা পাশ্চাত্যের তারকা পরিবারদের মধ্যে থাকলেও এখন অহরহ দেখা যায়। ছবির কোনো ধ্বনি বা ভাষা থাকে না, তবে এটি সরাসরি দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করে। আজকের তোলা একটি ছবি আগামী দিনে অতীতের গল্প বা স্মৃতি হয়ে ধরা দেয়।

