স্টাফ রিপোর্টার :
১৬ আগস্ট ২০২৬
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মো. হাসান শওকত নিজের দপ্তরে চেয়ারে বসা। তাঁর টেবিল ঘিরে বসা ও দাঁড়ানো আরও ছয় থেকে সাতজন। তাঁরা বড় বড় খামের মধ্য থেকে ১ হাজার ও ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিল বের করে রাখছেন টেবিলের ওপর। বিভিন্ন কথাবার্তার মধ্যে একজন বললেন, ‘স্যারের কাছে ৫ লাখ টাকা রেখে যান।’
প্রকৌশলী হাসান শওকতের টেবিলে অর্থ লেনদেনের এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে একটি ভিডিওতে। গোপনে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইইডির ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে।
তবে ভিডিওটি ঠিক কবে ধারণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির আগে হাসান শওকত প্রায় আড়াই বছর (২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ) ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে কর্মরত ছিলেন। ভিডিওটি ওই সময়কার বলে জানিয়েছেন ওই দপ্তরের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভিডিওটির সত্যতা স্বীকার করে হাসান শওকত গতকাল শনিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একটি কাজের বিষয়ে দুই ঠিকাদার মিলে আমার রুমে সমঝোতা করেছে। টাকাগুলো ওই ঠিকাদারদের। এর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনগুলোর সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সংস্কার এবং আসবাব সরবরাহ করে। এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ, আইসিটি-সুবিধা সরবরাহও করে।
আজকের পত্রিকার হাতে আসা ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওই সময় কক্ষে হাসান শওকত ছাড়া মোট সাতজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘পারফরম্যান্স গ্যারান্টির (পিজি) মেয়াদ কবে… পিজির মেয়াদের জন্য স্যারের কাছে ৫ লাখ টাকা রেখে যান। পিজির মেয়াদ বের করে দিয়েন…স্যারের কাছ থেকে নিয়ে যাইয়েন।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওতে দেখা যাওয়া অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী। মূলত ঠিকাদারি কাজের অবৈধ সুবিধা নেওয়ার জন্য তাঁরা হাসান শওকতকে অর্থ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ।
হাসান শওকতের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ
ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে হাসান শওকতের বিরুদ্ধে কাজ না করেই ঠিকাদার অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে বিল পরিশোধের অভিযোগ আছে। যেসব কাজের বিপরীতে অগ্রিম এবং চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়েছে, তাঁর কয়েকটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। আর বেশ কয়েকটি কাজ কিছুদিন আগে শেষ হয়েছে।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, রাজধানীর কোতোয়ালি থানাধীন আনোয়ারা বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেরামতের কাজে কোনো কাজ করা না হলেও ১৯ লাখ টাকা চূড়ান্ত বিল দিয়েছিলেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকত।
এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন ঢাকা মেট্রোর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মু. মোস্তাফিজুর রহমান। নোটিশে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট ওই প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনকালে বিলে স্বাক্ষরিত কোতোয়ালি থানার সহকারী প্রকৌশলী, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও ঠিকাদারের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এ সময় ওই শিডিউলভুক্ত কোনো কাজ সম্পাদন করা হয়নি মর্মে প্রতিষ্ঠান প্রধান অবহিত করেন।
এর বাইরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার পশ্চিম ইউসুফ উচ্চবিদ্যালয়ে কোনো কাজ করা না হলেও ঠিকাদারকে ১০ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়। একইভাবে উত্তরখান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ৮ লাখ টাকা এবং দাশেরকান্দি দারুচ্ছুন্নাহ আলিম মাদ্রাসার কাজে ১০ লাখ টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় হাসান শত্তকত ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাসান শওকত বলেন, ‘আমি জ্ঞানত কোনো অগ্রিম বিল দেইনি। উল্টো অগ্রিম বিল বন্ধ করার জন্য চিঠি দিয়েছি।’
কাজগুলোর বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে ইইডির নির্বাহী প্রকৌশলী (ঢাকা মেট্রো) মনজুরুল আলম শরীফ গতকাল বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে যোগদান করেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই।’
ইইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ইইডিতে চাকরিরত অবস্থায় হাসান শওকত নানা অনিয়মে জড়িয়েছেন। দায়িত্ব পালনকালে একাধিক প্রধান প্রকৌশলী তাঁকে সতর্কও করেছিলেন। একাধিক অভিযোগ থাকার পরও হাসান শওকতকে গত বছরের ১০ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দিয়ে ঢাকা মেট্রোতেই পদায়ন করা হয়েছে।
জানতে চাইলে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী গতকাল বলেন, ‘ভিডিওটি এখনো আমার নজরে আসেনি। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে অবশ্যই বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

