ঢাকা২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

“জমি লিখে না দিলে হ’ত্যা” তাঁতী লীগ নেতা প্রবাসী পল্লী’র চেয়ারম্যান মহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

admin
মে ২১, ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্টাফ রিপোর্টার: আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমানের ভাই এবং তাঁতী লীগের প্রভাবশালী নেতা প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের চেয়ারম্যান মহিদুর রহমান মুহিদকে ঘিরে হত্যাসহ নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। উচ্চ আদালতের রিটের অপব্যবহার, কৃষিজমি দখল, সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে এখন ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী গ্রুপ।

নরসিংদীর মাধবদী এলাকার কান্দাইল মৌজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আবাসন প্রকল্প নিয়ে ভুক্তভোগী কৃষক, বিনিয়োগকারী ও স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কিত কার্যক্রম চালিয়ে এসেছে।

পাঁচ হাজার প্রবাসী প্রতারণার শিকারঃ
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে অন্তত পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রবাসী ও সাধারণ গ্রাহক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের টার্গেট করে “নিরাপদ বিনিয়োগ”, “স্বপ্নের প্লট” ও “দ্রুত হস্তান্তর” এর প্রলোভন দেখিয়ে শত কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর কিস্তি পরিশোধ করেও প্লট বুঝে পাননি। কেউ কেউ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের পরও এখন পর্যন্ত জমির কোনো বৈধ কাগজপত্র কিংবা দখল বুঝে পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, কাগজপত্রে অস্পষ্টতা এবং অনুমোদনবিহীন প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চালানো হয়েছে। অনেক প্রবাসী জীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলেও জানা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নানা জটিলতার কারণে অসংখ্য পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেকে ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও প্রতিকার পাননি।

মহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার অভিযোগঃ
তাঁতী লীগের প্রভাবশালী নেতা মহিদুর রহমান মুহিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যা, জমি দখল, প্রতারণা, হুমকি প্রদান, ক্ষতিগ্রস্থদের মারধর, আদালতের নির্দেশ অমান্য এবং আর্থিক অনিয়মসহ একাধিক অভিযোগে মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মামলার মধ্যে কয়েকটি বর্তমানে সিআইডি-এর তদন্তাধীন রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ব্যাহত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন সময়ে আপস-মীমাংসার চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

রিটের অপব্যবহারের অভিযোগঃ
স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্চ আদালতের একটি রিটকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং-৬১২৯/২০১১ দেখিয়ে এলাকায় এককভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি রয়েছে বলে প্রচার চালানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই রিটের কাগজ দেখিয়ে কৃষকদের জমি বিক্রিতে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ভিন্ন মত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এই বিষয়ে, ব্যারিস্টার আক্তার-উল-আলম বলেন, আদালতের সীমিত নির্দেশনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি উচ্চ আদালতের আদেশের অপব্যবহার এবং আদালত অবমাননার শামিল।

আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগঃ
জানা গেছে, ২০২৪ সালের দেওয়ানি মামলা নং-১২১/২০২৪-এ নরসিংদী সদর সহকারী জজ আদালত সংশ্লিষ্ট জমিতে কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা না করার নির্দেশ দেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে এখনো প্রকল্প এলাকায় মাটি ভরাট ও নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে মহিদুর রহমানের প্রবাসী পল্লী কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের দাবি, আদালতের রায় অমান্য করে প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

রাজউক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নেইঃ
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো রাজউক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই এটি পরিচালিত হচ্ছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর চেয়ারম্যান মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, পূর্বাচল প্রবাসী পল্লী প্রকল্পের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তিনি বলেন, রাজউক থেকে প্রকল্পটির সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, সরকারি খাল, জলাশয় ও কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা এবং জরিমানা করা হয়েছে। জলাধার সংরক্ষণ আইনে রয়েছে একাধিক মামলাও।

গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগঃ
প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে উচ্চ মুনাফা ও প্লট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভূমিদস্যু মহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বহু গ্রাহক বছরের পর বছর কিস্তি পরিশোধ করেও প্রতিশ্রুত প্লট বুঝে পাননি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বল্প পরিমাণ জমি ক্রয়ের বিপরীতে কয়েক হাজার প্লট বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের বিশাল একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী হারুন মিয়া বলেন,
“প্রবাসীরা সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে প্লটের আশায় টাকা দিয়েছেন। অনেকে ৮০ শতাংশের বেশি কিস্তি পরিশোধ করেও আজ পর্যন্ত প্লট পাননি। কেউ কেউ এই অপেক্ষায় মৃত্যুবরণও করেছেন।

রাজনৈতিক প্রভাব ও গোপন বৈঠকের অভিযোগঃ
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে মহিদুর রহমানের নাম। অভিযোগ উঠেছে, রাজধানীর বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বৈঠকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ বক্তব্য দেয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনকে প্রভাবিত করে প্রবাসী পল্লী গ্রুপ দীর্ঘদিন অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর কিছু সময় আড়ালে থাকলেও বর্তমানে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংশ্লিষ্ট চক্রটি।

মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগঃ
ভুক্তভোগী হারুন সরকার মাধবদী থানায় দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করেন, প্রায় এক বছর আগে কান্দাইল মৌজার প্রায় পাঁচ একর জমি রাতের আঁধারে দখল করে বালু ভরাট করা হয়। পরে সেখানে পাকা দেয়াল নির্মাণের চেষ্টা হলে স্থানীয়রা বাধা দেন। এ সময় তাকে মারধর এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মামলা প্রত্যাহার এবং জমি প্রবাসী পল্লীর নামে লিখে দিতে চাপ দেওয়া হয়। অন্যথায় হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

কৃষিজমি দখল ও বালু ভরাটের অভিযোগঃ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নরসিংদীর কান্দাইল মৌজায় হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, খাল-বিল ও জলাশয় অবৈধভাবে বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, একসময় যেখানে ধান, পাট, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হতো, এখন সেখানে শুধুই বালুচর। স্থানীয় বাসিন্দা রতন মিয়া, মানিক ও সাইদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্প সম্প্রসারণের নামে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে। কৃষিজমি হারিয়ে শত শত পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক কৃষককে ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি করতে বাধ্য করা হয়েছে। কোথাও কোথাও রাতের আঁধারে জমি দখল করে বালু ভরাট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন বলেন,“একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

বক্তব্য মেলেনি মহিদুর রহমানেরঃ
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রবাসী পল্লী লিমিটেডের চেয়ারম্যান মহিদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে ভুক্তভোগী কৃষক, গ্রাহক ও স্থানীয়রা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।