
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জবাবদিহিতার জন্য ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের ফাঁকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম জিটিও’র মেহদি হাসানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, ‘ভারত যদি নিজে একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে তারা হয়তো শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে যাবে। আর যদি কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, যা ভারত উপেক্ষা করতে পারবে না, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।’
জেটিওতে ৩৪ মিনিটের পুরো সাক্ষাৎকারটি সোমবার প্রচার করা হয়।তবে গতকাল মঙ্গলবার ওই সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়া, শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয়, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা ও নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন ড. ইউনূস। দৈনিক আমাদের সময়ের পাঠকদের জন্য আজও সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো:
সাক্ষাৎকারে মেহদি হাসান জানতে চান, ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে, গত গ্রীষ্মে ছাত্র আন্দোলনে হাসিনার দমনমূলক পদক্ষেপে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে। অবশ্যই আপনি আমার চেয়ে ভালো জানেন যে, তিনি ভারতে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। সেখানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুরক্ষায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে বাংলাদেশে ফেরানোর জন্য আপনি বারবার অনুরোধ করেছেন। জবাবদিহির জন্য তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দিতে আপনার আহ্বান মোদি উপেক্ষা করায় আপনি কী করেছেন? আপনি কি বিশ্বাস করেন, ভারত কখনো হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে?
জবাবে অধ্যাপক ইউনূস: বলেন, ‘তারা যদি নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সম্ভবত তারা তাকে রেখে দেবে। যদি আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে থাকে, যা তারা এড়াতে পারবে না, তখন পরিস্থিতিটা ভিন্ন হবে।’
মেহদি হাসান: তাকে রাখার পেছনে ভারতের স্বার্থ কী?
ড. ইউনূস: তারা বরাবরই তাকে সমর্থন করে আসছে। যারা তার পেছনে আছে, তারা সম্ভবত এখনো আশা করছে যে তিনি পূর্ণ গৌরবের সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন, একজন বিজয়ী নেতা হিসেবে ফিরছেন।
মেহদি হাসান: নিউইয়র্ক টাইমস খবর প্রকাশ করেছে যে, তিনি (শেখ হাসিনা) আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভার্চুয়্যাল বৈঠক করছেন। এটা কি আপনাকে উদ্বিগ্ন করে যে, ভারত তাকে ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছে এবং আবার ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টার করছে?
অধ্যাপক ইউনূস: ‘আমি ঠিক এভাবে কথাগুলো বলব না। তবে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, বাইরের কিছু শক্তি তাকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে সহায়তা করবে। আমরা সব সময় এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন।’
মেহদি হাসান: আপনি কি মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন?
অধ্যাপক ইউনূস: আমি মোদির সঙ্গে কথা বলেছি।
মেহদি হাসান: আপনি যখন তাকে (শেখ হাসিনা) বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ফিরিয়ে দিতে বললেন, তখন তিনি (মোদি) কী বলেছিলেন?
অধ্যাপক ইউনূস: দুটি বিষয়। প্রথমত, আমি বলেছিলাম, আপনারা যদি তাকে রাখতে চান, তার সঙ্গে কী করবেন তা আমি আপনাকে বলতে পারি না। তবে এটা নিশ্চিত করেন যে, তিনি আমাদের সম্পর্কে কথা বলবেন না। তিনি যেন বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে কথা না বলেন।
মেহদি হাসান: দুঃখিত, মোদি আপনাকে এ কথা বলেছিলেন, নাকি আপনি তাঁকে বলেছিলেন?
অধ্যাপক ইউনূস: আমি মোদিকে বলেছিলাম। বলেছিলাম যে অনুগ্রহ করে নিশ্চিত করেন।
মেহদি হাসান: তিনি কী বলেছিলেন?
অধ্যাপক ইউনূস: তিনি বলছিলেন, আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
মেহদি হাসান: হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আপনার সরকার তার সাবেক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে, তাদের নিবন্ধন স্থগিত করেছে, কার্যত পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে তাদের নিষিদ্ধ করেছে। আপনার মতোই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেন-যিনি আপনাকে খুব ভালো করেই চেনেন, তিনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, এটা পূর্ববর্তী সরকারের ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে, যারা ক্ষমতায় এসে তাদের বিরোধীদের নিষিদ্ধ করেছিল। আপনি কেবল সেই চক্রের পুনরাবৃত্তি করছেন। অমর্ত্য সেন ও অন্যদের এ ধরনের সমালোচনার কী জবাব দেবেন আপনি?
অধ্যাপক ইউনূস: এটা ভুল সমালোচনা। কারণ, আমরা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করিনি।
মেহদি হাসান: আমি বলছি, আপনি তো নিবন্ধন স্থগিত করেছেন?
অধ্যাপক ইউনূস: না, নিবন্ধন নয়। শুধু তাদের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
মেহদি হাসান: এর অর্থ কী?
অধ্যাপক ইউনূস: : এর অর্থ হলো, তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারে না।
মেহদি হাসান: তাহলে আপনি মূলত, আমি বলছি, তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
অধ্যাপক ইউনূস: না, না। দলটি এখনো আছে।
মেহদি হাসান: তারা কি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে?
অধ্যাপক ইউনূস: না এখন পারবে না। তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
মেহদি হাসান: ঠিক আছে, তাহলে এটা কীভাবে... তারা কি দল হিসেবে বৈধ?
অধ্যাপক ইউনূস: আচ্ছা, তারা দল হিসেবে বৈধ। তবে এখন কার্যক্রম স্থগিত। যেকোনো সময় এর কার্যক্রম চালু করা হতে পারে।
মেহদি হাসান: আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনি স্থগিতাদেশ তুলে নিতে পারেন?
অধ্যাপক ইউনূস: স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া। এটা একটা সম্ভাবনা।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.