আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কর্মক্ষম অঙ্গ হলো লিভার বা যকৃৎ। রক্ত পরিশোধন, খাবার হজম করা এবং শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করাসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করে এই অঙ্গটি। তবে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া এবং জীবনযাত্রার অনিয়মের কারণে আজকাল অনেকেই লিভারের নানা সমস্যায় ভুগে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভার যখন ধীরে ধীরে তার কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে বা ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হয়, তখন শরীর নিজেই বিভিন্ন সংকেত দিতে শুরু করে। এরমধ্যে অনেক লক্ষণই প্রকাশ পায় আমাদের হাত ও পায়ে, যা সাধারণ সমস্যা ভেবে অনেকেই এড়িয়ে যান।
হাত ও পায়ে লিভারের রোগ বা জটিলতার যেসব লক্ষণ সচরাচর প্রকাশ পেতে পারে, তা নিয়ে সম্প্রতি চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বিশেষ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই লক্ষণগুলো সম্পর্কে—
১. হাত ও পায়ে অতিরিক্ত চুলকানি
হাত বা পায়ের তালুতে যদি বিনা কারণে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র চুলকানি অনুভূত হয়, তবে তা লিভারের সমস্যার অন্যতম একটি সংকেত হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, লিভারে কোনো গোলযোগ দেখা দিলে শরীরে ‘পিত্ত লবণ’ বা বাইল সল্টের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই লবণ রক্তে মিশে ত্বকের নিচে জমা হওয়ার ফলে হাত ও পায়ের তালুতে প্রচণ্ড চুলকানি শুরু হতে পারে।
২. হাত ও পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া
লিভারের রোগ বাড়লে রক্তে ‘অ্যালবুমিন’ নামক বিশেষ প্রোটিনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এই প্রোটিনের ঘাটতির কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে জল জমতে শুরু করে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘এডিমা’ নামে পরিচিত। এর প্রভাবে অনেক সময় গোড়ালি, পায়ের পাতা এবং হাত ফুলে যায়। জুতো পরতে সমস্যা হওয়া বা আঙুলে চাপ দিলে গর্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
৩. হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হলে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার ফলে হাতের তালুর চামড়া স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লালচে বর্ণ ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে বুড়ো আঙুল ও কনিষ্ঠ আঙুলের নিচের মাংসল অংশ বেশি লাল হয়ে যায়।
৪. আঙুলে পরিবর্তন বা ক্লাবিং
লিভার সিরোসিস বা দীর্ঘমেয়াদি লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের হাতের আঙুলের আকৃতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক সময় আঙুলের ডগাগুলো ফুলে ওঠে এবং নখের আকৃতি কিছুটা চামচ বা ঘড়ির কাচের মতো বাঁকা হয়ে যায়।
৫. হাত-পায়ে দুর্বলতা ও পেশিতে টান ধরা
লিভার শরীরে পুষ্টি উপাদান শোষণ ও জমা রাখতে বাধাগ্রস্ত হলে পেশিগুলো প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। এর ফলে প্রায়ই হাত-পায়ে অসম্ভব দুর্বলতা অনুভব হতে পারে এবং মাঝেমধ্যেই পেশিতে টান (ক্র্যাম্প) ধরার সমস্যা দেখা দেয়।
লিভারের রোগ সন্দেহ হলে কী করবেন?
হাত-পায়ের এসব পরিবর্তন দেখা দিলেই লিভারের রোগ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে এসব লক্ষণের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া কিংবা পেট ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক লিভার ফাংশন টেস্ট, অন্যান্য রক্ত পরীক্ষা কিংবা আলট্রাসনোগ্রামের পরামর্শ দিতে পারেন। পরীক্ষার ফলাফল ও রোগের ধরন বিবেচনায় চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। লিভারের রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা কমানো সম্ভব। তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

