সত্য সমাচার ডিজিটাল:
০৩ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর তেহরান পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। এই পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে পরিচালিত হয়েছেÑ ইসরায়েল, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব ও ইরাক। হামলার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও স্থাপনা, যা অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ইরানি কর্মকর্তারা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ইঙ্গিত দিলে বৈশ্বিক তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও সরু চওড়া পথের কারণে সামান্য অস্থিতিশীলতা বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
গত শনিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কাছ থেকে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি বার্তা পাচ্ছে, যেখানে বলা হচ্ছেÑ হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধ করেনি। বরং চলমান সংঘাতের কারণে কয়েকটি ট্যাংকার মালিক কোম্পানি সাময়িকভাবে পরিবহন স্থগিত করেছে।
একটি বড় ট্রেডিং ডেস্কের শীর্ষ নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, আমাদের জাহাজগুলো কয়েক দিন স্থির থাকবে। গ্রিসসহ কিছু দেশ তাদের জাহাজকে এই জলপথ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে যে কোনো অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নাড়া দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালির এক পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্য পাশ ইরান দ্বারা বেষ্টিত। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এবং প্রতিটি দিকে জাহাজ চলাচলের পথ প্রায় ৩ কিলোমিটার।
সরু হলেও এই পথ দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পাঠাতে এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতি এই পথে নির্বিঘ্ন চলাচলের ওপর নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-ইআইএ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। এর বার্ষিক বৈশ্বিক বাণিজ্যমূল্য প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। এই তেল আসে ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।
প্রণালিটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক এলএনজি চালানের প্রায় ২০ শতাংশ এই করিডর দিয়ে গেছে, যার বেশিরভাগই কাতার থেকে এসেছে।
এই প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি ও আমদানি উভয়ই হয়। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উপসাগরের বাইরে থেকে আমদানি করা জ্বালানি যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা চালান গ্রহণ করে। ২০২৪ সালে প্রণালি দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেলের ৮৪ শতাংশ এশিয়ার বাজারে গেছে। এলএনজির ক্ষেত্রেও প্রায় ৮৩ শতাংশ এশিয়ায় পৌঁছেছে। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলিয়ে প্রণালি দিয়ে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের ৬৯ শতাংশ গ্রহণ করেছে। এই উপকূলীয় দেশগুলোর কারখানা, বিদ্যুৎ গ্রিড এবং পরিবহন ব্যবস্থাগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রণালি বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে এবং তা সরকারিভাবে অনুমোদিত হতে হবে। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুইউ শু আল জাজিরা বলেছেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল তীব্রভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের উভয় পাশে নোঙর করা জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে, কারণ তেহরানের সম্ভাব্য নৌপথ বন্ধের সতর্কবার্তার পর জাহাজ মালিকরা সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
গত রবিবার ওমান উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজে আঘাত হানে, যা সংঘাতের বিস্তার এবং সামরিক স্থাপনা থেকে জ্বালানি সম্পদের দিকে লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শিপিং তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালির বাইরে উপসাগরের খোলা পানিতে নোঙর করেছে।
যুদ্ধের কারণে দুই দিনের জন্য শেয়ারবাজার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, সোমবার ও মঙ্গলবার শেয়ারবাজার বন্ধ থাকবে। খবর আল-জাজিরার।
ইউএই ক্যাপিটাল মার্কেটস অথরিটি জানিয়েছে, আবুধাবি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ ও দুবাই ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট ২ এবং ৩ মার্চ বন্ধ থাকবে।
এক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিস্থিতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি শেয়ারবাজার মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ পাঁচটি বৃহত্তম স্টক এক্সচেঞ্জ মার্কেটের মধ্যে রয়েছে। দুই শেয়ারবাজারে এ অঞ্চলের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত রয়েছে।
এদিকে, রবিবার মধ্যপ্রাচ্যের শেয়ারবাজারগেুলোয় তীব্র পতন দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের প্রধান সূচক ওপেনিংয়ে ৪ শতাংশের বেশি কমেছে। ওমানের সূচক কমেছে ৩ শতাংশ। মিশরের প্রধান সূচক ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এদিন কুয়তে সম্পূর্ণভাবে লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহে প্রায় ২০ শতাংশ বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। তেলের দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকবে। প্রাকৃতিক গ্যাস, জেট ফুয়েল, গ্যাসোলিন ও ন্যাফথাসহ অন্যান্য জ্বালানির দামও বাড়বে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৬০-.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। দুর্বল অর্থনীতিগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মন্দার দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যেতে হলে জাহাজগুলোকে ওমান উপসাগর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এর ফলে জাহাজের যাত্রাপথ ২ হাজার থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার বেড়ে যাবে। এতে যাত্রার সময় কয়েক সপ্তাহ বাড়তে পারে এবং পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেয়ে যাবে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে।

