সত্য সমাচার ডিজিটাল:
২২ আগস্ট ২০২৬
রাজনীতিতে দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা এবং দলের দুঃসময়ে ধারাবাহিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। দলের সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়। সেই দায়িত্বে রিজভীকেই বেছে নিয়েছে বিএনপি।
ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসা রিজভীর জন্য এটি রাজনৈতিক জীবনের বড় এক স্বীকৃতি। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থেকে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং এরপর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব- অল্প সময়ের ব্যবধানে দলের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দায়িত্বে আসীন হলেন তিনি।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলের একটি সাংগঠনিক সভায় অংশ নেন রিজভী। সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমার মধ্যে দুটি অনুভূতি আছে। একটা হচ্ছে একটু গর্ব হয় যে আমাকে এই পদ দেওয়া হয়েছে। আমি যদিও এটার যোগ্য নই, এর জন্য আমার আনন্দ হয়। আবার ভয়ও হয় যে আমি এ দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারব কিনা। এই বোধটাও সবসময় কাজ করছে।’
বিএনপির পক্ষ থেকে গত বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের গঠনতন্ত্রের ৭(খ)৬ ধারা অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মনোনীত করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর হয়।
মাঠের সংগঠক হিসেবে পরিচিতি : বিএনপির রাজনীতিতে রিজভীর পরিচয় মূলত মাঠের সংগঠক ও দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে। দীর্ঘদিন ধরে দলের কর্মসূচি, আন্দোলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন তিনি। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি ও দলীয় অবস্থান জানাতে প্রায় নিয়মিতই নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দেখা যেত তাকে। নির্বাচন, আন্দোলন, সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং দলীয় কর্মসূচি নিয়ে তার বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। এ সময় মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হয়েছে তাকে।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন রিজভী। এরপর দীর্ঘ সময় এই পদে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার সাংগঠনিক দক্ষতার ওপর আস্থা রাখে দল। নির্বাচনের জন্য গঠিত বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নির্বাচনী মাঠের সমন্বয় থেকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নÑ সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।
সবশেষ চলতি আগস্টের ১৫ তারিখে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন রিজভী। এর কয়েক দিনের মধ্যেই পেলেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে তার রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে : রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা শুরু বিএনপির রাজনীতি দিয়ে নয়। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর বামপন্থি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।
পরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় তার রাজনৈতিক জীবনে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে দ্রুত সংগঠক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতিও হন।
১৯৯২ সালের ১৬ জুন ছাত্রদলের কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন রিজভী। সংগঠনটির ইতিহাসে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রথম সভাপতি ছিলেন তিনি। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পরে গুমের শিকার ইলিয়াস আলী। তবে কমিটি গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায়, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তা ভেঙে দেওয়া হয়।
এর আগে ১৯৮৯ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন রিজভী। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। রাকসুর ভিপি ও ছাত্রনেতা হিসেবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ওই আন্দোলনে নির্যাতন ও মেরুদণ্ডে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
ছাত্ররাজনীতির সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সংগঠনে তার অন্যতম শক্তি হয়ে ওঠে। রাজপথের কর্মসূচি থেকে দলীয় কার্যালয়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডÑ দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন তিনি।
‘দুঃসময়ের নেতা’ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা : বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলীয় অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে সামনে থেকে কাজ করেছেন রিজভী। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে দলের রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এ কারণে দলের নেতাকর্মীদের কাছে ধীরে ধীরে ‘দুঃসময়ের নেতা’ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।
মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, বিভিন্ন সংকটে যখন অনেক নেতা আত্মগোপনে ছিলেন বা মামলায় জর্জরিত, তখন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে দলীয় কর্মসূচির সমন্বয় করেছেন রিজভী। প্রান্তিক পর্যায় থেকে আসা নেতাকর্মীদের কথা শোনা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের পরিবারের খোঁজ নেওয়ার কারণেও তৃণমূলে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পর দলের তৃণমূলেও উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। ঢাকা, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন নেতাকর্মীরা। সামাজিক মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্টও দিয়েছেন অনেকে।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, ‘রুহুল কবির রিজভী ভাইকে বিএনপির দুর্দিনের কাণ্ডারি বলা হয়। তার মতো কর্মীবান্ধব নেতা দলের এই পদে দায়িত্ব পাওয়ায় আমরা আনন্দিত। তার দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষা বিবেচনা করেই দল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সাংগঠনিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘রাজপথের লড়াইয়ের পাশাপাশি দলীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন রুহুল কবির রিজভী। তাই রিজভী আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত ত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।’
সামনে বড় পরীক্ষা : রিজভীর দায়িত্ব গ্রহণকে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারাও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি দলকে আরও সুসংগঠিত করবেন এবং কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ আরও কার্যকর করবেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, আন্দোলনমুখী রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় বিএনপির সাংগঠনিক রূপান্তরের সময়েই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন রিজভী। তার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে সামনে। এতদিন রাজপথে দাঁড়িয়ে দলের পক্ষে কথা বলা রিজভীকেই এখন দলের বিভিন্ন স্তরকে সামলে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব রিজভীর জন্য শুধু পদোন্নতি নয়, বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাও। বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে। ফলে দীর্ঘদিনের আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতির অভিজ্ঞতার পর তাকে এবার সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, তৃণমূলের প্রত্যাশা এবং দলীয় কর্মসূচিÑ সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী এখন রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ ধরে রাখা হবে রিজভীর অন্যতম বড় দায়িত্ব।
ছাত্ররাজনীতি থেকে সংগঠন, রাজপথ থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং দলের দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকাÑ রিজভীর রাজনৈতিক পথচলায় এই ধারাবাহিকতাই তার বর্তমান অবস্থান তৈরি করেছে। মির্জা ফখরুলের বিদায়ের পর তার হাতে মহাসচিবের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি আপাতত সেই মাঠের সংগঠক ও পরীক্ষিত নেতার ওপরই আস্থা রাখল। তবে আন্দোলনরত দলের অন্যতম প্রধান মুখ থেকে সরকারে থাকা একটি বড় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে তার রূপান্তর কতটা সফল হয়, সেটিই এখন তার রাজনৈতিক জীবনের বড় পরীক্ষা।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.