স্টাফ রিপোর্টার
ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম, এবং পরিচালক পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ধীরাজ মালাকার মিলে বিদেশে প্রায় হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষভাবে সুবিধাভোগী এই তিন ব্যক্তির সম্পদ ও দুর্নীতির খোঁজে নেমে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এমন তথ্যের সন্ধান পেয়েছে।
দুদকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনুসন্ধান চলাকালে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা মেলেনি। বারবার প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি নানা অজুহাতে তা এড়িয়ে গেছে, এমনকি অনুসন্ধান দলের সদস্যদের হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র
দুদকের নথি বলছে, চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সভায় মঞ্জুরুল ইসলাম ও ধীরাজ মালাকারের সম্পদ, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভূমি দখল, প্রতারণা ও বিদেশে অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিষয়াদি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুসন্ধান যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের নামও।
পাঁচ সদস্যের এই অনুসন্ধান কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক শাহ আলম শেখ ও এস এম রাশেদুল হাসান এবং উপ-সহকারী পরিচালক রুবেল হোসেন ও হাবিবুর রহমান। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কমিটির প্রধান হাফিজুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনুসন্ধান কমিটির এক সদস্য জানান, মঞ্জুরুল ইসলাম শুধু ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডেই সীমাবদ্ধ নন—তিনি বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লেক্স, নাভানা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড, জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, সুরমা লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ (পিএলসি) এবং আফতাব বহুমুখী ফার্ম লিমিটেডেরও পরিচালক পদে রয়েছেন। বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেন বলে জানা গেছে। একাধিকবার সাক্ষাতের জন্য সময় চাওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে এবং কমিটি আবার তার সাক্ষাতের জন্য সময় চাইবে বলে জানিয়েছেন ওই সদস্য।
অনুসন্ধান কমিটির আরেকজন সদস্যের ভাষ্যমতে, মঞ্জুরুল ইসলামের দুর্নীতির মূল দুই সহযোগী হলেন ধীরাজ মালাকার ও মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, যারা তার দুর্নীতির কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা তথ্য অনুযায়ী—
১. হাউজিং ব্যবসার আড়ালে ঢাকার রামপুরা, আফতাবনগর ও মিরপুর এলাকায় সাধারণ মানুষের ভিটেমাটিসহ সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট তৈরি করে অবৈধভাবে বিক্রি করেছেন মঞ্জুরুল ও তার দুই সহযোগী, যার মাধ্যমে তারা শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
২. নিজেদের প্রভাব বলয় সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগনি ও যুক্তরাজ্যের সাবেক ‘সিটি মিনিস্টার’ টিউলিপ সিদ্দিককে ঘুষ হিসেবে ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন তারা।
৩. সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করে সেখানেও প্লট তৈরি করেছেন মঞ্জুরুল ও তার সহযোগীরা।
৪. যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন তারা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে মঞ্জুরুল ইসলাম, ধীরাজ মালাকার ও মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে।
মঞ্জুরুলের ‘টিউলিপ কানেকশন’
অবৈধ সুবিধা নিয়ে রাজধানীর গুলশানে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের একটি ফ্ল্যাট নেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে ও যুক্তরাজ্যের সাবেক সিটি মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৫ এপ্রিল মামলা করে দুদক। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় আসামি করা হয়েছে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা শাহ মো. খসরুজ্জামান এবং সাবেক সহকারী আইন উপদেষ্টা-১ সরদার মোশারফ হোসেনকে। অভিযোগ, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো অর্থ পরিশোধ ছাড়াই ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের গুলশান-২ এলাকার একটি ফ্ল্যাট (ফ্ল্যাট নং বি/২০১, বাড়ি নং ৫এ ও ৫বি পুরোনো, বর্তমানে ১১৩ ও ১১বি নতুন, রোড নং ৭১) অবৈধভাবে দখলে নেন এবং পরবর্তীতে তা নিজেদের নামে রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন।
এই মামলার তদন্তে মঞ্জুরুল ইসলামের নামও উঠে এসেছে। দুদক সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টিউলিপ ছাড়াও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর কোন কোন আত্মীয় মঞ্জুরুলের মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জানা গেছে, তদন্ত শেষে দাখিল হতে যাওয়া চার্জশিটে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
শুধু দুদকের অনুসন্ধান নয়, আফতাবনগর প্রকল্পের বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লট মালিক ও গ্রাহকদের একাংশও ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন। তাদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্বনোটিশ ছাড়াই প্লট বরাদ্দ বাতিল করা হচ্ছে, অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে, পেমেন্ট গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং গ্রাহকদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
‘আফতাবনগর ভুক্তভোগী প্লট মালিকবৃন্দ’ ব্যানারে সংগঠিত হয়ে ভুক্তভোগীরা গত ৩ মে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচি পালন করেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিক আহমেদ, পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম এবং পরিচালক (লিগ্যাল) মতিউর রহমান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৪ ধারা অনুসারে কোনো গ্রাহক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলেও অন্তত ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ ছাড়া তার প্লট বরাদ্দ বাতিল করার সুযোগ নেই। বরং বিলম্বে কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ সুদসহ অর্থ গ্রহণের বিধান রয়েছে আইনে। কিন্তু বাস্তবে কোনো লিখিত নোটিশ, শোকজ বা ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ না দিয়েই প্রায় ১০০ থেকে ১২০টি প্লট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এছাড়া পূর্বনির্ধারিত মূল্যের বাইরে গিয়ে প্রতি কাঠায় ২০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা, যা তাদের ভাষায় সম্পূর্ণ বেআইনি ও প্রতারণামূলক।
সব মিলিয়ে দুদকের অনুসন্ধান ও গ্রাহকদের অভিযোগ-দুই দিক থেকেই ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ও এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর চিত্র উঠে এসেছে, যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জশিট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
তবে এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। আর চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম ও পরিচালক মাজহারুল ইসালের সাথে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.