সত্য সমাচার ডিজিটাল:
১২ আগস্ট ২০২৬
সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রই একাকী; দলছুট। রবীন্দ্রনাথও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিশোর রবীন্দ্রনাথ যখন তার সৃষ্টিজগতে একাকী বাস করছিলেন, তখন তার জীবনে এলো কিশোরী কাদম্বরী দেবী। তার মেজদা বা নতুনদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী। সেই হিসেবে কাদম্বরী হলেন রবীন্দ্রনাথের নতুন বউঠান। বিয়ের অল্পদিনেই কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গড়ে ওঠে এক গভীর সখ্য। পরে রবীন্দ্রনাথের মানস গঠনে এই নতুন বউঠানের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। মানে রবীন্দ্রনাথের ‘রবীন্দ্রনাথ’ হয়ে ওঠায় যার প্রেরণা এবং অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন কাদম্বরী দেবী।
কেমন ছিল রবির নতুন বউঠান? ‘একদিন চতুর্দোলায় চড়ে একটি ছোট মেয়ে ‘গোধূলিলগ্নে সিঁদুর রঙে’ রাঙা চেলি পরে প্রবেশ করলেন ঠাকুরবাড়িতে। তার কাঁচা শ্যামলা হাতে সরু সোনার চুড়ি, গলায় মোতির মালা, সোনার চরণচক্র পায়ে। বাড়ির ছোট ছেলেটির মনে হলো, এতদিন যে রাজার বাড়ি খুঁজে খুঁজে সে হয়রান হয়েছে, খুঁজে পায়নি, সেই বাড়িটিরই বুঝি খবর নিয়ে এলো এই রূপকথার রাজকন্যে, মাত্র আট বছরের তার নতুন বউঠান, কাদম্বরী’।
কাদম্বরী কলকাতার মেয়ে। তার বাবা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগাযোগ ছিল অনেকদিন ধরেই। সেই সূত্রেই দ্বারকানাথ শ্যামলের মেয়েকেই তার মেজছেলের বউ করে আনলেন। কালক্রমে আট বছরের সেই কাদম্বরীই ঠাকুরবাড়ির যোগ্য বউ হয়ে উঠলেন। সৌন্দর্যপ্রিয় কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির তিনতলার ছাদের ওপর গড়ে তুললেন ‘নন্দনকানন।’ অল্পদিনেই কিশোর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার গড়ে ওঠে দারুণ বন্ধুত্ব। কাদম্বরীর স্বামীর সঙ্গে অসম সম্পর্কের যে ফাঁক ছিল, সেখানেই জায়গা করে নিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাদের দুজনের বন্ধুত্ব এতটাই গভীর হয়ে উঠেছিল যে, তারা যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠলেন। বাড়িতে বউঠানের আমসত্ত্ব পাহারা দেওয়া থেকে আরও ‘পাঁচ রকম খুচরো কাজের সাথি’ হতে শুরু করেছিলেন কিশোর রবি। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল কাদম্বরীকে সারাজীবন হেয়প্রতিপন্ন করেছে। স্বামীর কাছেও তার যথেষ্ট কদর ছিল না। বিয়ের ষোলো বছরেও তিনি সন্তানের মা হতে পারেননি। এ দুঃখ-কষ্টের মাঝে রবিই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। রবি যখন বলতেন, ‘নতুন বউঠান, ভুবনজুড়ে এত আনন্দ, সেই আনন্দধারাকে অন্তরে গ্রহণ করো। দেখবে ঝরাপাতার মতো পুরনো দুঃখ সেই আনন্দস্রোতে ভেসে গেছে!’
কাদম্বরী দেবী অসাধারণ সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন। বই পড়ার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। দুপুরবেলা রবীন্দ্রনাথ তাকে নিজের লেখা বই পড়ে শোনাতেন। কালক্রমে কাদম্বরী হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথের লেখার একনিষ্ঠ পাঠক-সমালোচক এবং অনুপ্রেরণাও। কাদম্বরী খুব অল্পদিনেই নিজেকে সামান্য থেকে অসামান্য করে তুলেছিলেন, যা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। কেবল রূপে-গুণে, রুচিতে নয়, লেখাপড়া, গানবাজনা, অভিনয়েও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। ঠাকুরবাড়িতে তখন কাদম্বরীর নন্দনকাননে সন্ধ্যাবেলায় গান ও সাহিত্য পাঠের আসর বসত। সে আসরের বর্ণনা পাওয়া যায় এমন, মাদুরের ওপর তাকিয়া, রুপোর রেকাবে ভিজে রুমালের ওপর বেলফুলের গোড়ের মালা, এক গ্লাস বরফজল, বাটাভর্তি ছাঁচি পান সাজানো থাকত। কাদম্বরী গা ধুয়ে, চুল বেঁধে তৈরি হয়ে বসতেন সেখানে। জ্যোতিরিন্দ্র বাজাতেন বেহালা, তার সঙ্গে রবি ধরতেন চড়া সুরের গান। বাড়ির অনেকে যোগ দিতেন সে আসরে। বাইরে থেকে আসতেন অক্ষয় চৌধুরী ও তার স্ত্রী শরৎ কুমারী, জানকীনাথ, মাঝে মাঝে আসতেন কবি বিহারীলাল। আসরে নতুন বউঠানের মোহনীয় রূপ কিশোর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সৌন্দর্যচেতনা জাগাতে যথেষ্টই সহায়ক ছিল। রবীন্দ্রনাথের কবি হয়ে ওঠার পেছনে এই নারী অমূল্য হয়ে উঠেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ দীপ্তকণ্ঠে স্বীকারও করেছিলেন, ‘খুব ভালোবাসতুম তাকে। তিনিও আমায় খুব ভালোবাসতেন। এই ভালোবাসায় নতুন বউঠান বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে আমার প্রাণের তার বেঁধে দিয়ে গেছেন।’ রবীন্দ্রনাথের বিয়ের দুমাস পরে অর্থাৎ ১৮৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ছবি ও গান’ প্রকাশিত হলো। সেটি তিনি উৎসর্গ করলেন নতুন বউঠানকেই। লিখেছিলেন, ‘গত বৎসরকার বসন্তে মালা গাঁথিলাম। যাঁহার নয়নকিরণে প্রতিদিন প্রভাতে এই ফুলগুলি একটি একটি করিয়া ফুটিয়া উঠিত, তাহারি চরণে ইহাদিগকে উৎসর্গ করিলাম।’
কিন্তু সেই সুখের দিন খুব বেশি স্থায়ী হলো না। রবীন্দ্রনাথের বিয়ের মাত্র চার মাস পর নতুন বউঠানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিরবিচ্ছেদ ঘটে গেল। তখন বসন্ত কেবল বিদায় নিয়েছে। শুরু হয়েছে গ্রীষ্মের প্রখরতা। এমনই একদিনে আত্মহননের জন্য আফিম বা ঘুমের ওষুধ খেলেন কাদম্বরী, রবির নতুন বউঠান। তবে তখনই তিনি মারা যাননি। দুদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ভোরের আলো ফোটার আগে নিভে গেল তার জীবন প্রদীপ। কেন তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন? সেটা কি রবির বিচ্ছেদ বা অভিজাত ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে তার সামাজিক অবস্থানগত বৈষম্যের কারণে? এ প্রশ্নের জবাব বোধকরি সঙ্গে নিয়ে চলে গেছেন কাদম্বরী। এর ঊনত্রিশ বছর পর রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায় এই মৃত্যু সম্পর্কে লিখলেন, ‘আমার চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইলো তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে...!
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.