
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় এক মাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের পর গত সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনার জের ধরে শনিবারের এই হামলার ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে খার্গ দ্বীপের কাছে একটি ট্যাংকারসহ দুটি জাহাজকে ‘স্থায়ীভাবে অকার্যকর’ এবং তৃতীয়টিকে ওমান উপসাগরে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও মার্কিন হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তিনটি মার্কিন-সংশ্লিষ্ট জাহাজ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আরও তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে।
ইরানের দাবি, ওই তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে ‘অননুমোদিত’ একটি রুট ব্যবহার করছিল। এ ধরনের রুট ব্যবহার না করতে অন্য জাহাজগুলোকেও সতর্ক করেছে আইআরজিসি।
এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, ইরানের হামলার লক্ষ্য ছিল দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ- একটি বিমানবাহী রণতরী ও একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। সেন্টকমের দাবি, জাহাজ দুটি আইআরজিসির একাধিক হামলা সফলভাবে এড়িয়ে গেছে এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি।
মার্কিন বাহিনী আরও দাবি করেছে, তারা যে তিনটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, সেগুলো আইআরজিসি ও এর আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে ব্যবহৃত ‘বহু বিলিয়ন ডলারের ছায়া নেটওয়ার্কের’ অংশ।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরিব জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপের কাছে মার্কিন হামলার শিকার ট্যাংকারটিতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। মূল ভূখণ্ড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এনে সেখান থেকেই তা জাহাজে তোলা হয়।
ওমান উপসাগরে হামলার শিকার অন্য দুটি ট্যাংকারের ক্রুদের লাইফবোটে করে তীরে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরিব। তাদের একজন খালি ছিল এবং অন্যটিতে তেল ছিল বলে জানানো হয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর আইআরআইবি জানায়, আইআরজিসি অঞ্চলটির আরও ছয়টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ছিল হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্য তিনটি ছিল বিভিন্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যত বন্ধ রয়েছে। জলপথটির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তেহরান এর আগে জানিয়েছে, এই জলপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের কিছুটা অংশ তারা বজায় রাখবে।
ইরান এর আগে ওমানের জলসীমা দিয়ে চলাচলকারী দক্ষিণাঞ্চলীয় বিকল্প রুট ব্যবহার করা জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি ‘খোলা’ রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করছে।
শনিবারের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ইরান যদি মার্কিন জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস ও ডুবিয়ে দেবে।
এর এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাতকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। শনিবারের হামলা নিয়ে ট্রাম্প এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।
প্রায় এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করে। মার্কিন বাহিনী জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন স্থাপনে ব্যবহার করা হতে পারে এমন দুটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করতে ওই হামলা চালানো হয়। মঙ্গলবার ট্রাম্প আরও একটি ‘খুব বড় হামলা’র কথা জানান এবং দাবি করেন, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত খুব বেশি সময় স্থায়ী হবে না।
এরপর ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়।
এদিকে, দক্ষিণ ইরানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হওয়ার ইরানি দাবির বিষয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ছিল বলে দাবি করেছে তেহরান। বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওই হামলার দাবির বিষয়ে ‘চরম সংশয়’ প্রকাশ করলেও ঘটনাটি তদন্ত করা হবে বলে জানান।
ইরানের মানবিক সহায়তা সংস্থা ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, মঙ্গলবার সিরিক শহরে একটি বাড়িতে আয়োজিত ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো আঘাত হানে। ঘটনাটিকে তেহরান ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.