নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ জুলাই ২০২৫,
গাড়িটি মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ক্রয় করা হয়েছিল চারটি ক্যাম্পাসের কার্যক্রম তদারকির জন্য। অথচ আজ সেই স্কুলের লোগো ঢাকা পড়ে আছে সভাপতির ব্যক্তিগত পরিচয়ে। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গাড়িটি যেন তার ব্যক্তিগত বাহন হয়ে গেছে।
স্কুলের প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর উন্নতির জন্য যে গাড়ি, সেটি এখন নিয়মিত ছুটছে তার পারিবারিক ও বেসরকারি কাজে। গাড়ির সামনের অংশে ‘স্কুল গাড়ি’ লেখা থাকার কথা থাকলেও, সেটির বদলে সাঁটানো হয়েছে সভাপতির নাম। যেন পুরো প্রতিষ্ঠানটিই ব্যক্তিগত সম্পত্তি!
শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ। তাদের প্রশ্ন—একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ কীভাবে একজনের একক ভোগে চলে যায়? গাড়িটি যেখানে ক্যাম্পাস পরিদর্শনে, শিক্ষার্থী বহনে বা শিক্ষক-পরিদর্শকের কাজে লাগার কথা, সেখানে তা এখন প্রায় পুরোপুরি সভাপতি ও তার ঘনিষ্ঠদের সেবায় নিয়োজিত।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে বসে এমন আচরণ শুধু অনিয়ম নয়, শিক্ষার নীতিকেও আঘাত করে। অভিভাবকরা অবিলম্বে এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা চান।তাহমিনা আক্তার বলেন , যেহেতু গাড়িটি আমাকে আনা নেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে এ কারণে গাড়ির নিরাপত্তার স্বার্থেই স্টিকার লাগিয়েছিলাম।
অন্যদিকে রাজধানীর এই মনিপুর স্কুলে এখন চলছে এক অদৃশ্য লুণ্ঠনের উৎসব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছিল শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন আর অভিভাবকদের কষ্টার্জিত টাকার ওপর ভর করে। অথচ সেই স্কুলের সভাপতি তাহমিনা আক্তার আজ স্কুলকে নিজের ব্যক্তিগত আয়ের খনি বানিয়ে তুলেছেন। কখনও প্রশাসনিক মিটিং, কখনও একাডেমিক বৈঠকের নামে টাকা তুলে নিচ্ছেন। এক সভার জন্য ২০ হাজার, আরেক সভার নামে ১২ হাজার—এভাবে একদিনেই ৩২ হাজার টাকা তুলে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে।
যে টিউশন ফি দিয়ে নতুন শ্রেণিকক্ষ গড়ার কথা, নতুন শিক্ষক নিয়োগের কথা—সেই অর্থ এখন ‘সভা বাণিজ্য’-এর মধুর ফাঁদে আটকে আছে। এ যেন লুণ্ঠনের এক নির্লজ্জ মহোৎসব!
বিধি ভেঙে নিয়োগের উদ্যোগ-
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অ্যাডহক কমিটি প্রচলিত আইন ও শিক্ষা বোর্ডের স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে পত্রিকায় শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে—যা নিয়ে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা।
জানা গেছে, বর্তমানে মনিপুর স্কুল পরিচালনা করছে একটি অ্যাডহক কমিটি, যার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার। গত ৩০ এপ্রিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ড তাকে এই দায়িত্ব দেয়। তিনি মূলত এই নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, যা তার এখতিয়ার বহিভূত।
শিক্ষা বোর্ডের প্রণীত প্রবিধান অনুযায়ী, কোনো অ্যাডহক কমিটির শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের এখতিয়ার নেই। এ সংক্রান্ত সরকারি বিধানে স্পষ্ট করে বলছে, “অ্যাডহক কমিটি কোনো অবস্থাতেই অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপারিনটেনডেন্ট, সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট, গ্রন্থাগারিক, সহকারী গ্রন্থাগারিক বা অন্য কোনো কর্মচারী বাছাই ও নিয়োগ করতে পারবে না। তবে শর্ত হচ্ছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA)-এর তালিকাভুক্ত কোনো প্রার্থী সুপারিশপ্রাপ্ত হলে কেবল তাকে নিয়োগ দেওয়া যাবে।”
এ বাস্তবতা উপেক্ষা করে মনিপুর স্কুলের অ্যাডহক কমিটি সম্প্রতি পত্রিকায় শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলা মিডিয়ামে ৭ জন, ইংরেজি ভার্সনে ৫ জন সহকারী শিক্ষক, কলেজ শাখায় ৩ জন শিক্ষক, ল্যাব সহকারী ২ জন ও কম্পিউটার ল্যাব সহকারী ৬ জন নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহী প্রার্থীদের ২০ জুলাইয়ের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছে এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে ২৬ জুলাই।
স্কুলের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মনিপুর স্কুলে বর্তমানে কোনো শিক্ষক সংকট নেই। বরং বিগত কয়েক বছরে ফলাফলের অবনতি ও নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে শিক্ষার্থী সংখ্যা ক্রমেই কমছে। সে অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যায়ও উল্লেখযোগ্য কোনো ঘাটতি নেই। তবুও স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অভিভাবকরা অভিযোগ তুলেছেন।
তারা প্রশ্ন তুলেছেন—যেখানে আইনে স্পষ্টভাবে এই নিয়োগ অবৈধ বলা আছে, সেখানে কার স্বার্থে ও কী উদ্দেশ্যে এমন বিতর্কিত উদ্যোগ নেওয়া হলো? কোনো গোপন স্বার্থকে পূরণ করতেই কি এই নিয়োগ প্রক্রিয়া?
অভিভাবকরা বলছেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়, বরং কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্যই নিয়মবহির্ভূত এই নিয়োগের চেষ্টা করছে। তারা এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়বদ্ধ এই অভিভাবকরা আশা করছেন, মনিপুর স্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হবে না—এমনই পদক্ষেপ নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ড।
‘‘তাহমিনা আক্তার বলেন, প্রয়োজনের তাগিদেই নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তবে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করেছি। ’’
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.