সত্য সমাচার ডিজিটাল:
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট-সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সরকারের তৈরি নয়। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং মহেশখালীর গ্যাস টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে সংকট সমাধানে সরকার বসে নেই, বরং বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
রিজভী বলেন, ‘সরকারের নিজস্ব ভূমিকা ও উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি। লকডাউনের নামে কিংবা নানা কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথ দখল করে রাখার হুমকি কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। সরকারের প্রতিটি কাজের সমালোচনা করার অধিকারও বিরোধী দলের আছে। গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকার তার ভুল-ত্রুটি বুঝতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। একইভাবে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, ‘বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওই পথে বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে এবং বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির বড় একটি অংশও এ পথ দিয়ে আসে।’
তিনি বলেন, ‘সমুদ্রপথে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও মাইন পাতা হচ্ছে, আবার কার্গো জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি আমদানিনির্ভর একটি দেশের জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা, বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস দেওয়া, কলকারখানা চালানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’
এই উপদেষ্টা বলেন, ‘বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও গভীরভাবে জড়িত। তাই সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কথা বলতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার অতীতের ব্যর্থতার কথা বলে চুপ করে বসে নেই। সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত গ্যাস আমদানির জন্য পার্শ্ববর্তী ও নিকটবর্তী দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘সেখানে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে এবং সেটি মেরামতের কাজ চলছে। একদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা, অন্যদিকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি—দুই কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই সংকট সরকারের কার্যক্রমের বাইরের বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। অথচ বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে ‘
তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যদি সরকারের সমালোচনা করে, তাহলে শুধু সমস্যা তুলে ধরলেই হবে না; সংকট সমাধানের পথও দেখাতে হবে। আমরা বলেছি, আপনারা সমাধানের একটি রূপরেখা দেন, সমাধানের পথ বের করেন। বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে।
রিজভী বলেন, ‘সংসদে সম্প্রতি কেউ কেউ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে কিছু কথা বলেছেন। কিন্তু এর আগে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো মতামত বা সমাধানের প্রস্তাব খুব একটা দেখা যায়নি।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘বর্তমান সংকটের পেছনে গত ১৭ বছরের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অনিয়মের প্রভাবও রয়েছে। আগের সরকার এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে, যেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে। জাতীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের দেওয়া হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানার সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। জনগণের অর্থ ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।’
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, ‘ব্যাংক খাত থেকেও জনগণের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইনডেমনিটি আইন করা হয়েছিল, যাতে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করা না যায়।’
তিনি বলেন, ‘কোনো সরকারের কাজ সন্দেহজনক মনে হলে জনগণের আদালতে যাওয়ার এবং অভিযোগ করার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু মানুষ যাতে মামলা করতে সাহস না পায়, সে জন্য দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মতে, এটি ছিল দুর্নীতির মানসিকতা থেকে তৈরি একটি ব্যবস্থা।’
গণমাধ্যম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনে গণমাধ্যমের মালিকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য, আত্মীয়তা কিংবা ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসন ও দুঃশাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিশু, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবন দিয়ে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, তার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।’
রিজভী বলেন, ‘দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে। এর ফলে সমাজে বিভেদ তৈরি হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার বাইরে এসে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা শুনতে হবে।’
চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের সামাজিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। সরকার যা করার তা করবে, কিন্তু নাগরিক হিসেবেও আমাদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে।’
রিজভী বলেন, ‘বর্তমান সংকটকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে তার উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে হবে এবং বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এমপি। সেমিনারে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটি আহবায়ক চিত্রনায়ক হেলাল খানের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান, জাসাসের সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকন, বিএনপির সহ সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদ সোহরাব, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সফু, গবেষনা বিষয়ক সম্পাদক শামিমুর রহমান শামিমসহ প্রমুখ।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.