প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ৩:১৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একই সঙ্গে উন্নয়নমুখী প্রশাসক, সামরিক শাসক, রাজনৈতিক কৌশলী এবং বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয়। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি প্রায় সাড়ে আট বছর দেশ শাসন করেন। তাঁর শাসনামলে উপজেলা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, শিল্পনীতি, ঔষধনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সামরিক আইন, বিতর্কিত নির্বাচন, সংবিধানের পরিবর্তন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা, বিরোধী দলের ওপর দমননীতি এবং দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে গভীরভাবে বিতর্কিত করে রেখেছে।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবের একটি অংশ কুচবিহার ও রংপুরে কেটেছে। তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। সামরিক জীবনের শুরুতে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার, চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করেন। পরে কোয়েটার স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষণ নেন এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক ইউনিটে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন।
১৯৬৯-৭০ সালে তিনি তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল করা হয়। একই বছর তিনি কর্নেল এবং ১৯৭৫ সালে ব্রিগেডিয়ার ও পরে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন।
১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৯ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ে সেনাপ্রধান হিসেবে এরশাদের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তিনি গণমাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেন এবং বেসামরিক সরকারের কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু তাঁর সরকার প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চাপের মুখে ছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে অপসারণ করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
ক্ষমতা গ্রহণের পর এরশাদ সংবিধান স্থগিত, জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত এবং সামরিক আইন জারি করেন। তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বা চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর—CMLA—ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপতির পদে বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরীকে বসানো হলেও বাস্তব ক্ষমতা ছিল এরশাদের হাতে। সামরিক আইনের ঘোষণায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছিল।
১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এরশাদ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন। এভাবে একজন সেনাপ্রধান প্রথমে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন, পরে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে নিজের শাসনকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এরশাদ আমলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক উদ্যোগ ছিল উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন। ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা থানা কাঠামো মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হতো। এরশাদ সরকার থানা পর্যায়কে উন্নয়ন প্রশাসনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেয়। ১৯৮২ সালের স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৪৬০টি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতেন। পরিষদে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, নারী সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। প্রথম উপজেলা পরিষদগুলোর নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা ১৯৮৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর লক্ষ্য ছিল উন্নয়ন প্রশাসনকে ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছিল।
উপজেলা ব্যবস্থা অনেক গবেষকের কাছে এরশাদ সরকারের একটি ইতিবাচক অবদান হিসেবে বিবেচিত। কারণ এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা ও প্রশাসনের কিছু ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল। ৬৪টি জেলার প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ৪৬০টি উপজেলা যুক্ত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রামাঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও ছিল। উপজেলা চেয়ারম্যানরা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে উপজেলা ব্যবস্থা একদিকে বিকেন্দ্রীকরণের কাঠামো তৈরি করলেও অন্যদিকে এরশাদ সরকারের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও জোরদার করে। বাংলাপিডিয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপজেলা ব্যবস্থা প্রশাসনিক ক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে কিছুটা স্থানান্তর করলেও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ ছিল।
এরশাদ সরকার দেশের প্রশাসনিক মানচিত্রেও বড় পরিবর্তন আনে। তৎকালীন ২২টি জেলার পরিবর্তে মহকুমাগুলোকে উন্নীত করে ৬৪টি জেলা গঠন করা হয়। এর ফলে জেলা প্রশাসন জনগণের কাছাকাছি আসে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পৃথক প্রশাসনিক ইউনিট বৃদ্ধি পায়। জেলা পরিষদ সক্রিয় করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
এরশাদ প্রশাসন সরকারি চাকরির কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসকে বিভিন্ন কার্যভিত্তিক ক্যাডারে বিভক্ত করে। সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি, শৃঙ্খলা ও আপিলসংক্রান্ত বিধিমালাও প্রণয়ন করা হয়। এর ফলে প্রশাসনিক নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনে একটি কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়।
তবে তাঁর শাসনামলে সামরিক কর্মকর্তাদের বেসামরিক প্রশাসনে ব্যাপকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সেনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে প্রশাসনের ওপর সামরিক প্রভাব বাড়ে এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
এরশাদ আমলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কয়েকটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক—উত্তরা, পূবালী ও রূপালী—বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। ১৯৮২ সালের শিল্পনীতি পরে ১৯৮৬ সালে আরও উদার করা হয়, যাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়।
এই সময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ শুরু হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠা তৈরি পোশাক শিল্পের প্রাথমিক বিস্তারের পেছনে আশির দশকের বেসরকারিমুখী শিল্পনীতির ভূমিকা ছিল। ১৯৮৯ সালে বিনিয়োগ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল শিল্প বিনিয়োগে সহায়তা করা এবং দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা।
তাঁর সরকার যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের উদ্যোগও নেয়। সেতুটির অর্থায়নের জন্য জনগণের কাছ থেকে কর সংগ্রহ এবং বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। যদিও সেতুটি পরবর্তী সরকারের আমলে নির্মিত হয়, এরশাদ আমলে এর প্রাথমিক পরিকল্পনা ও অর্থসংস্থানের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল।
১৯৮২ সালে প্রণীত জাতীয় ঔষধনীতি এরশাদ সরকারের অন্যতম আলোচিত পদক্ষেপ। এই নীতির মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ও অতিমূল্যের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ওষুধের দাম কমানোর চেষ্টা করা হয়। নীতিতে কিছু ভিটামিন, ক্যাপসুল ও অ্যান্টাসিড দেশীয় কোম্পানির উৎপাদনের জন্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা ছিল। এর ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় ঔষধশিল্প দ্রুত বিকাশের সুযোগ পায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের ঔষধশিল্প দেশের অন্যতম শক্তিশালী উৎপাদন খাত। এর বিকাশের পেছনে ঔষধনীতি একমাত্র কারণ নয়; দেশীয় উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও পরবর্তী নীতিগত সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে আশির দশকের নীতিটি দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রাথমিক সুযোগ দিয়েছিল—এটি এরশাদ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য ১৯৮৪ সালে নারী বিষয়ক পৃথক অধিদপ্তর গঠন করা হয়। পথশিশুদের জন্য ‘পথকলি ট্রাস্ট’ গঠন, পরিবেশ সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচিও তাঁর সরকারের সময় গ্রহণ করা হয়। এসব উদ্যোগের কিছু স্থায়ী প্রভাব ফেললেও অনেক প্রকল্প দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি।
এরশাদ সরকার ভূমি সংস্কারের জন্য ১৯৮২ সালে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৮৪ সালে ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ, ভূমি সংস্কার বিধিমালা এবং কৃষিশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। খাসজমি ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বণ্টন, বর্গাচাষিদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সরকারি জমিতে ভূমিহীনদের জন্য বসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ‘অপারেশন ঠিকানা’ নামে পরিচিত কর্মসূচির মাধ্যমে গুচ্ছগ্রাম তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
তবে ভূমি সংস্কারের বড় অংশ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বাধা এবং আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা সমস্যা তৈরি করে। ফলে নীতিগত ঘোষণা থাকলেও ভূমিহীনদের স্থায়ী পুনর্বাসন ও ভূমি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জিত হয়নি। এ কারণে এরশাদের ভূমি সংস্কার কর্মসূচিকে আংশিক ও সীমিত সফলতা হিসেবে মূল্যায়ন করা অধিক যুক্তিসংগত।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক বা SAARC গঠনে এরশাদের ভূমিকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। সার্ক গঠনের প্রাথমিক ধারণা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় উত্থাপিত হলেও এরশাদ সরকার উদ্যোগটি এগিয়ে নেয়। ১৯৮৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপকে নিয়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সার্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি দৃশ্যমান ভূমিকা অর্জন করে। আঞ্চলিক বাণিজ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সার্ককে একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়। ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন বাংলাদেশের কূটনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধিতেও সহায়ক ছিল।
এরশাদ শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত সাংবিধানিক পদক্ষেপ ছিল ১৯৮৮ সালের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা। সংবিধানের ২ক অনুচ্ছেদে বলা হয়, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”; একই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্ম পালনে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়।
সমর্থকদের মতে, এটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয়কে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপ। সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে এই পরিবর্তনের বিরোধ ছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণাকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এরশাদের ক্ষমতা বৈধ করার কৌশল হিসেবে দেখেছেন। সামরিক শাসন, বিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচনী সংকটের সময়ে ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তরের চেষ্টা তাঁর সরকারের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কৌশলের অংশ ছিল—এমন সমালোচনা তৎকালীন ও পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনায় দেখা যায়।
এরশাদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল গণতান্ত্রিক বৈধতার সংকট। ১৯৮৫ সালে গণভোটের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা বৈধ করার চেষ্টা করা হয়। বিরোধী দলগুলো ওই গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
১৯৮৬ সালের মে মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ এতে অংশ নেয়। এরশাদের জাতীয় পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একই বছর অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু প্রধান বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ না থাকায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
১৯৮৬ সালের সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনামলে জারি করা ঘোষণা, আদেশ ও কার্যক্রমকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ক্ষমতা দখলও পরোক্ষভাবে বৈধতা লাভ করে। এটি ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুতর বিতর্কের বিষয়।
১৯৮৭ সালে বিরোধী আন্দোলন তীব্র হলে এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। ১৯৮৮ সালের মার্চে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। ফলে জাতীয় পার্টি বিপুল বিজয় অর্জন করলেও সংসদের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলন ক্রমশ বিস্তৃত হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থী দলগুলো পৃথক জোটে আন্দোলন করলেও এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে তাদের অবস্থান এক হয়ে যায়। ছাত্রসমাজ এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠন করে রাজপথে সক্রিয় হয়।
১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর তিনটি রাজনৈতিক জোট গণতন্ত্রে উত্তরণের বিষয়ে একটি যৌথ ঘোষণা দেয়। একই বছরের ২৭ নভেম্বর জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও আন্দোলন থামানো যায়নি। ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আন্দোলনে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীও এরশাদ সরকারের প্রতি সক্রিয় সমর্থন প্রত্যাহার করে।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তাঁর পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।
পদত্যাগের পর এরশাদ দুর্নীতি ও অবৈধ অস্ত্র রাখার মামলায় গ্রেপ্তার হন। কারাগারে থেকেও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি রংপুর অঞ্চলের পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই জয়ী হন। এ ঘটনা তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও রংপুরভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় দেয়।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি প্রায় ছয় বছর বন্দিত্বের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। জাতীয় পার্টি নানা সময়ে বিভক্ত হলেও এরশাদ নিজস্ব রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হন।
২০০১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৪টি আসন পায়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে দলটি ২৭টি আসন অর্জন করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অধিকাংশ বিরোধী দল অংশ না নিলেও জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ৩৩টি আসন পায়। এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন এবং তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২২টি আসন লাভ করে এবং এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা হন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা ঠিক হবে না। তাঁর শাসনামলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পুনর্গঠন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, ঔষধনীতি, বেসরকারি খাতের বিকাশ, নারী উন্নয়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সার্ক প্রতিষ্ঠার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এসবের মধ্যে উপজেলা ব্যবস্থা ও ঔষধনীতি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে তিনি সংবিধানসম্মত নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। সামরিক আইন জারি, রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করা, বিরোধী দলের ওপর দমননীতি, সেনাবাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি, বিতর্কিত নির্বাচন, সংবিধানের পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন। তাঁর সরকারের উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
সুতরাং এরশাদকে কেবল ‘পল্লীবন্ধু’ বা কেবল ‘স্বৈরশাসক’ হিসেবে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কিছু কাঠামো তৈরি করেছিলেন, কিন্তু সেই কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গণতান্ত্রিক বৈধতার বাইরে গিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর স্থান তাই উন্নয়ন ও কর্তৃত্ববাদ, বিকেন্দ্রীকরণ ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক টিকে থাকা ও গণতান্ত্রিক সংকট—এই পরস্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গঠিত। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।