০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
দেশের গণমাধ্যমগুলো প্রচার করে বিভিন্ন জাতীয় দিবসকে কেন্দ্র করে ভাষার মাস, স্বাধীনতার মাস, বিজয়ের মাস, শোকের মাস। এটা কী সঠিক না বেঠিক সে বিচারও আমরা করি না। প্রশ্ন থাকে ভাষা তো মানুষের সার্বক্ষণিক এবং প্রতি মুহূর্তের প্রায়োগিক বিষয়। তাকে নির্দিষ্ট মাসের পরিসরে সীমাবদ্ধ করা তো যেমনি হাস্যকর, তেমনি উপহাসতুল্য। ভাষার মাস শেষে এক বছরের জন্য বাংলা ভাষা সম্পর্কিত সব কর্মকা- এক বছরের জন্য শিকায় তুয়ে রাখব সযত্নে! ফি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে বাংলা ভাষা নিয়ে আমরা অতি আবেগে মাতামাতি শুরু করে দিই। এবং ফেব্রুয়ারি শেষে ভাষার প্রসঙ্গটি ভুলে বসি। ভাষা যেন নির্দিষ্টভাবে ফেব্রুয়ারি মাসেরই বিষয়, বাকি এগারো মাস যেন ভাষার কোনোই আবেদন আমাদের জাতীয় ও সমাজ জীবনে প্রয়োজন পড়ে না। অথচ ভাষা আমাদের প্রতি মুহূর্তের বিষয়। ভাষাই আমাদের সব যোগাযোগ ও নিকটবর্তিতার কেন্দ্রে। এ এক অদ্ভুত সংস্কৃতি আমাদের মনোজগতে আসন গেড়ে বসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন কেবল আবশ্যক নয়, জরুরিও বটে।
ভাষার এই ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিবছর আড়ম্বরপূর্ণ মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন করে থাকে বাংলা একাডেমি। বইমেলা নিয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাসের ঢল নামে সর্বত্র। বইমেলা নিয়ে আবেগ-স্তুতির কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না। প্রাণের মেলা, হৃদয়ের মেলা, ভালোবাসার মেলা ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়ে থাকে বইমেলাকে। বইমেলা চিত্তবিনোদনের মেলা নয়। নয় ভোগবিলাসেরও। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের আনুষ্ঠানিকতাও নয়। অনিবার্যই জ্ঞানের মেলা। জ্ঞান আহরণে পাঠক যেমন বইয়ের খোঁজে ছুটে যায়। তেমনি প্রকাশকরা জ্ঞান বিতরণে বইয়ের পসরা সাজিয়ে মেলা প্রাঙ্গণকে প্রাণবন্ত করে তোলে। স্বীকার করতেই হবে, জ্ঞানের বাহন হচ্ছে বই। পাঠক এবং প্রকাশকদের মিলিত উদ্যোগে বইমেলা হয়ে ওঠে জ্ঞান অনুশীলনের মিলনমেলা। এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে চিত্তবিনোদনের সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা ক্রমেই বিপরীত অভিমুখে ছুটছে। অতি আবেগ-উচ্ছ্বাসের ফলে বইমেলার প্রকৃত আবেদন ক্ষুণœ হয়ে চলেছে। আবেগ তো ক্ষণস্থায়ী, এই আছে, এই নেই। কিন্তু চেতনাগত দৃষ্টিভঙ্গি বা অঙ্গীকার স্থায়ী। এটা অস্বীকার করা যাবে না।
অথচ আমরা বইমেলায় কী দেখে থাকি? বইমেলায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। বই ক্রেতা বা পাঠকের স্থলে দর্শনার্থী বলেছি সঙ্গত কারণে। কেননা যে পরিমাণ মানুষের সমাগম ঘটে বইমেলায় তাতে যদি ১০% দর্শনার্থী বই ক্রয় করত তবে কোনো স্টলে অবশিষ্ট বই থাকত না। নিঃশেষ হয়ে যেত। বইমেলায় সেলফি তোলা, ভিডিও ধারণ করার বাহুল্য দেখে হতাশ হতে হয়। বইমেলায় যাওয়া এক ধরনের মর্যাদাকর আভিজাত্যের উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বইমেলায় গেলে বোদ্ধা ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার এক ধরনের উন্মাসিক মানসিকতা তৈরি হয়েছে। আগে বইমেলা থেকে ফেরার সময় প্রায় প্রত্যেকের হাতে শোভা পেত বইয়ের প্যাকেট। এখন তেমনটি দেখা যায় না।
এক সময় কতিপয় লেখকের চটুল গল্প, উপন্যাসের রমরমা কাটতি ছিল। মেলা চলাকালীন কয়েকটি সংস্করণও প্রকাশিত হতো। পাশাপাশি বিজ্ঞান নিয়ে কল্পকাহিনির তথাকথিত সায়েন্স ফিকশনের রমরমা ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। আশার কথা এখন ভাটির টান পড়েছে। ওইসব বাজারি লেখকের পাঠক গড়ে উঠলেও সেটা তাদের বইয়ের পাঠক কেবল সৃষ্টি করেছিল। সামগ্রিকভাবে পাঠক সৃষ্টি তারা করতে পারেনি। এখন তো তাদের পাঠক শূন্যে দাঁড়িয়েছে। পাঠককে বিজ্ঞানের স্থলে বিজ্ঞানের কল্পকাহিনি কিংবা মধ্যবিত্তের জীবনাচারের পাঁচালি আর কাঁহাতক গিলানো যাবে। তরুণ প্রজন্ম এখন ইতিহাস, দর্শন, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, অর্থনীতি, সমাজ ইত্যাদি গবেষণামূলক প্রবন্ধে আকৃষ্ট হচ্ছে। হরেক নেতির ভিড়ে এটা অবশ্যই আশা জাগানিয়া। প্রকাশকরা পর্যন্ত এখন প্রবন্ধ সাহিত্য প্রকাশে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠেছে। দেশের প্রধান প্রকাশকদের স্টলে গেলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
কলকাতায় আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশের বইমেলায় কবার গিয়েছি। সেখানকার পাঠকদেরও দেখেছি গল্প, উপন্যাস, কবিতার বইয়ের বিপরীতে প্রবন্ধ সাহিত্যের বই কিনতে। আমাদের প্রবন্ধ সাহিত্য কলকাতার পাঠকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আমাদের প্রকৃত পাঠকদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বেশ মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। গবেষণাধর্মী বইয়ের কদর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রমাণ করে তরুণ প্রজন্ম জ্ঞান অন্বেষণে ক্রমাগত উৎসাহী হয়ে উঠেছে। এতে অপচয়কারী বইয়ের প্রভাব কমছে, ভবিষ্যতে আরও কমবে বলেই ভরসা করছি।
আমাদের দেশে মাসব্যাপী বৃহৎ বইমেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি, এই বইমেলায় কেবল দেশে প্রকাশিত বই ছাড়া বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা এবং আসামের বইয়ের প্রবেশাধিকার রাখা হয়নি। তাই এই বইমেলাকে স্থানীয় বইমেলা বলা যায়। বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করা হলে বাঙালি জাতিসত্তার লেখক-পাঠকের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারত। আমাদের পাঠকরাও তাতে উপকৃত হতো। ভারতের বাংলাভাষী লেখকদের বইয়ের মান, বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমাদের ধারণা বৃদ্ধি পেতে পারত। কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলায় আমাদের বই নিয়ে প্রকাশকরা অনায়াসে যেতে পারে। মোহরকুঞ্জের বাংলাদেশের বইমেলা প্রতিবছর হয়। সেখানে কেবল বাংলাদেশের বইয়ের বাইরে অন্য কোনো বইয়ের প্রবেশের সুযোগ নেই। ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় বছরে দুটি বইমেলা হয়। একটি রাজ্য সরকারের ব্যবস্থাপনায়। অপরটি আগরতলা পাবলিশার্স গিল্ডের আয়োজনে। ওই দুই বইমেলায়ও বাংলাদেশের প্রকাশকরা বই নিয়ে হাজির হন। আসামের বইমেলায়ও আমাদের অনেক প্রকাশক অংশগ্রহণ করে থাকেন। এতে সাংস্কৃতিক একতরফা বিনিময় হলেও আমাদের দেশে পশ্চিম বাংলা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা ভাষার বইয়ের কোনো বইমেলা না হওয়াটা দুঃখজনক বটে। আমরা নিশ্চয় ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক কিন্তু আমাদের জাতিসত্তা অভিন্ন। অভিন্ন আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি। আমাদের পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ে উভয়ে ঋদ্ধ হতে পারব বলেই বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন গুরুত্ববহ বলেই মনে করি।
অবিভক্ত বাংলায় বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পাঠস্থান ছিল কলকাতা। আমরা ওই প্রভাববলয়ের অন্তর্গত ছিলাম। সাতচল্লিশের দেশভাগের পরও কলকাতার এবং বোম্বের বাংলা, হিন্দি চলচ্চিত্র এখানে অবাধে প্রদর্শিত হতো। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বই, পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী নিয়মিত ঢাকায় এসে সারা দেশে বিপণন হতো। কিশোর বয়সে শিশু সাহিত্য সংসদের ছড়ার বই ঢাকা থেকে ক্রয় করে বাবা আমাদের হাতে তুলে দিতেন। পৃষ্ঠাজুড়ে ছবি এবং ছয় থেকে আট লাইনের ওই ছড়া আমাদের পাঠাভ্যাস তৈরিতে সহায়তা করেছিল। এ ছাড়া নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী, লীলা মজুমদার, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায়, অবনঠাকুরের কিশোর উপযোগী বইগুলো আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.