সত্য সমাচার ডেস্ক
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশের সময় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই সেই প্রত্যাশায় কিছুটা ভাটা পড়ে। দল গঠনের পর থেকেই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা এবং কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগে দলটির ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যে আশাবাদ নিয়ে তরুণদের এ দলটি যাত্রা শুরু করেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গায় কিছুটা হতাশাও জায়গা করে নিয়েছে।
গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। এক বছরের ব্যবধানে নানা বিতর্কে জড়ালেও দলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন দেখাতে পেরেছেÑ রাজপথের আন্দোলন থেকে উঠে এসে সংসদে ছয়জন প্রতিনিধি পাঠাতে সক্ষম হয়েছে তারা। নতুন দল হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য।
তবে শুরু থেকেই দলটিকে ঘিরে নানা বিতর্ক রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগবিহীন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গড়ে ওঠা এনসিপিকে প্রতিষ্ঠিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তার অভিযোগ আছে। সমালোচকদের কেউ কেউ এটিকে ‘কিংস পার্টি’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সহায়তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতাÑ এসব অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
‘দেশ যাবে নতুন পথে, ফিরবে না আর ফ্যাসিবাদে’Ñ এই স্লোগান সামনে রেখে ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে। ধানমন্ডির আবাহনী মাঠে ইফতার মাহফিলের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আন্দোলনের আবেগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্দোলনভিত্তিক শক্তির উত্থান নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনÑ প্রতিটি সময়েই রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে রাজপথ। তবে আন্দোলনের শক্তিকে টেকসই সাংগঠনিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া সবসময়ই কঠিন ছিল।
জুলাই গণ-আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্ব থেকেই এনসিপির উত্থান। শুরুতে অনেকেই একে ক্ষণস্থায়ী আবেগের বহিঃপ্রকাশ ভেবেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দলটি সাংগঠনিক পরিচয় স্পষ্ট করেছে এবং সংসদেও জায়গা করে নিয়েছে। এখন প্রশ্নÑ এই উত্থান কি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ধারায় রূপ নেবে, নাকি সময়ের স্রোতে ম্লান হয়ে যাবে?
মতাদর্শ ও বিকল্প রাজনীতির ভাষা
এনসিপি নিজেদের মূল্যবোধনির্ভর ও সংস্কারমুখী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা, নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা। এসব বিষয় বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করেছে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা হলোÑ নীতিগত অবস্থানকে কার্যকর কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া না গেলে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ধরে রাখা কঠিন। একটি দল তখনই পরিপক্ব হয়, যখন তারা শুধু প্রতিবাদ নয়, সুস্পষ্ট বিকল্প নীতিও উপস্থাপন করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, যেহেতু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল, সেহেতু তাদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেছে এনসিপিকে। কিন্তু যে প্রত্যাশা নিয়ে দলটা গঠিত হয়েছিল, সে রকম দ্রুতই দলটা সম্পর্কে নানা আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক, দুর্নীতির খবর চাউর হয়েছে। এর সবকিছু যেমন সত্য নয়, সবকিছু উড়িয়েও দেওয়া যাবে না। ফলে এ দল সম্পর্কে মানুষের আবেদনও এখন কমে যাচ্ছে।
সাংগঠনিক বিস্তার ও চ্যালেঞ্জ
রাজধানীকেন্দ্রিক আলোচনা ছাড়িয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করছে দলটি। সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা ও তরুণ কর্মীদের উপস্থিতি তাদের দ্রুত পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু সংগঠন মানে কেবল উপস্থিতি নয়; শৃঙ্খলা, আর্থিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি।
গ্রামীণ ভোটারদের আস্থা অর্জন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শহুরে শিক্ষিত তরুণদের সমর্থনে জাতীয় পর্যায়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী দলীয় বক্তব্যেও এ বাস্তবতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র রক্ষা, নেতৃত্বের স্বচ্ছতা এবং মতপার্থক্য সামাল দেওয়াও নতুন দলের বড় পরীক্ষা। অতীতে অনেক সম্ভাবনাময় দল অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি কোনো আসন পায়নিÑ এ থেকেই বোঝা যায় রাজনীতিতে টিকে থাকা সহজ নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, এনসিপি এখন সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি কেবল একটি নতুন দলের আত্মপ্রকাশ নয়; বরং একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রচেষ্টা। বহু দল আছে যুগের পর যুগ রাজনীতি করছে অথচ সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সংসদে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই। কিন্তু তরুণদের দলটি থেকে প্রথমবারই ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। এটা রাজনীতিতে নতুন বার্তা শুধু নয়; ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইঙ্গিতও বহন করছে।
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল হিসেবে এনসিপির প্রতি জনমনে বিপুল আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটির অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও কিছু নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সেই প্রত্যাশাকে ক্ষুণ্ন করেছে। জ্যেষ্ঠ মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদকে ঘিরেও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দলীয়ভাবে শোকজসহ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও নেতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।
দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার স্বীকার করেছেন, জনগণের প্রত্যাশার মাত্রায় পৌঁছাতে তারা এখনও সক্ষম হননি। তার দাবি, নানা অপপ্রচার চালানো হলেও দল সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রজন্মগত রাজনীতির ইঙ্গিত
অনেকে এনসিপির উত্থানকে প্রজন্মগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছেন। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, বৈষম্য ও রাজনৈতিক অনাস্থা একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্মের চাহিদা তৈরি করেছে। এনসিপি সেই চাহিদাকে ধারণ করার চেষ্টা করছে। তারা এমন একটি রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে নাগরিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা গুরুত্ব পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আন্দোলনের আবেগ দিয়ে সূচনা সম্ভব হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি নিতে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। কেন্দ্রীয় নেতাদের গড় বয়স তুলনামূলক কম হওয়ায় সাংগঠনিক স্থায়িত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকতেই পারে।
তবে রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক সময় স্বল্প সময়ের মধ্যেই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়। প্রথমবারেই ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া নতুন দলের জন্য ইতিবাচক বার্তা। এখন সংসদে তাদের ভূমিকা, নীতি প্রস্তাব ও বাস্তব কাজের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ অবস্থান।
বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত মোহাম্মদ কামরুল ইসলামের মতে, এনসিপির মূল শক্তি তাদের নৈতিক উচ্চারণ। তারা রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগী হিসেবে নয়, বরং সামাজিক চুক্তির পুনর্গঠন হিসেবে দেখতে চেয়েছে। এনসিপি এখন সংসদে যাবে, জনগণের কথা বলবে, এখন সেই পরীক্ষাই সবচেয়ে বড়।
এক বছরে রাজপথ থেকে সংসদে উঠে আসা এনসিপির সামনে তাই বড় প্রশ্নÑ তারা কি প্রত্যাশার ঘাটতি পূরণ করে নতুন আস্থার ভিত্তি গড়তে পারবে, নাকি হতাশার ছায়াই দীর্ঘ হবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।

