সত্য সমাচার ডিজিটাল:
গত এক বছরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে বলছে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য । একই সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের মোট মামলার প্রায় এক–তৃতীয়াংশই ছিল ধর্ষণের অভিযোগ।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। পাবনায় দাদিকে হত্যা করে নাতনিকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। নরসিংদীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক কিশোরী পরে হত্যার শিকার হয়। সীতাকুণ্ডে সাত বছরের এক শিশুকে যৌন সহিংসতার পর গলা কেটে দেওয়া হয়; দেড় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। কক্সবাজারের উখিয়ায় সাহরির সময় বাড়িতে ঢুকে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও নারী নিপীড়নের ঘটনা সামনে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী সাবেক প্রেমিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় দুই তরুণীকে মারধরের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’।
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এ জন্য সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি ধর্ষণের অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন এবং শিশু ১ হাজার ৮৯৭ জন।
উচ্চ আদালতের তথ্য বলছে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে ৩০ হাজারের বেশি মামলা।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, নারীর ওপর সহিংসতা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেকের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে নারীর ওপর সহিংসতা করেও পার পাওয়া যাবে। তাই বিষয়টিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে সাময়িক আলোচনা হয়, কিন্তু পরে ভুক্তভোগীর মামলার অগ্রগতি বা তদন্তের মান তদারকি করা হয় না। অনেক সময় ঘটনাও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তদন্ত করা ধর্ষণ মামলার ৪৪ শতাংশে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব মামলার অন্তত ৩০ শতাংশ সত্য হলেও সাক্ষ্য–প্রমাণের অভাব, বাদীর অনীহা বা তদন্তের দুর্বলতার কারণে তা প্রমাণ করা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত তদন্ত শেষ করা, পেশাদার সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সাক্ষী সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আইনি, আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা বাড়াতে ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

