অনলাইন ডেস্ক
২৬ এপ্রিল ২০২৬
রাহুল সাংকৃত্যায়ন রচিত ‘ভল্গা থেকে গঙ্গা’ বইতে প্রাচীন বৌদ্ধ পণ্ডিত অশ্বঘোষকে নিয়ে একটি গল্প রয়েছে। হ্যাঁ, গল্পই, ইতিহাস আশ্রয়ী, কিন্তু গল্প। ওই গল্পের নায়িকার একসময় মনে হয়, একদিন সে বৃদ্ধা হয়ে যাবে। কিন্তু নায়কের মনে তাকে থাকতে হবে চিরযৌবনা হয়ে। ব্যস, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা! নায়কের মনে চিরযৌবনা হয়েই বেঁচে রইল সে। কিন্তু এভাবে কি সত্যিই চিরযৌবনা হয়ে কারও মনে স্থান করে নেওয়া যায়? আর নারীর বয়স বাড়লেই সে ভালোবাসার অযোগ্য বা বাতিল হয়ে যায়?
বয়স নিয়ে যুগ যুগ ধরে এভাবেই নারী হীনম্মন্যতায় ভুগেছে, ভুগছে। অথচ বয়স বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে নারীর দেহমনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলতে গেলে কালিমালেপন করে দিয়েছে। তাই চুলে একটু পাক ধরলে, চামড়ায় সামান্য ভাঁজ এলেও নারী দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়, কীভাবে এসব গোপন করা যায়। শখের পুরুষ না হলে অল্পবয়সী কোনো নারীতে মজে যেতে পারে। সুতরাং নারীর বয়স বৃদ্ধি মানে শুধু হীনম্মন্যতাই নয়, বরং একজন নারীর আত্মবিশ্বাসে তা আঘাত হানতে থাকে। চারপাশের অল্পবয়সী নারীদের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে, নিরাপত্তাহীনতার অস্বস্তিতে ভোগে- নারীর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক সংকট এটি। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা তো বটেই সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রীর বণিকরাও নারীকে এই সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। প্রসাধনসামগ্রীর পাশাপাশি জমে উঠেছে বোটক্স, ফিলার ও বিভিন্ন কসমেটিক সার্জারির সংস্কৃতিও। দীর্ঘমেয়াদি সার্জারির ঝুঁকি জেনেও নারীরা ওই পথেই আজকাল হাঁটছেন। ফলে আজকাল এক নারীর সাজ পোশাক, প্রসাধন ও সৌন্দর্যে কোনো স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় না।
টিকটকে সম্প্রতি একটি গান খুব জনপ্রিয়। গানের লিরিক অনেকটা এমন, আমি গুচি বা luis uvitton-এর মতো নামিদামি ব্র্যান্ডের প্রডাক্ট ব্যবহার না করলেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি। আমি হেঁটে গেলে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে। অর্থাৎ গানের নারী অন্য সবার চেয়ে আলাদা। বলা হয়ে থাকে, সব নারীই নাকি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অথচ আজকাল নারীদের দিকে তাকালে একজনের সঙ্গে আরেকজনের কোনো পার্থক্য পাবেন না। সবারই চেষ্টা তাকে যেন সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে যৌন আবেদনময়ী দেখায়। এটিই এখন সৌন্দর্যের সূচক। সবাই একই স্টাইলে হাসছে, কথা বলছে, সবার চুল প্রায় একইরকম কালার করা, স্ট্রেইট করা। জীবন্ত বার্বিডল সাজার চেষ্টায় রত একেকজন। একটা বিয়ে বাড়িতে গেলে আসল কনে কোনজন ঠাহর করতে পারবেন না! তাহলে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যটা কোথায় হারাল? মিডিয়ার নারীদের ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার ধরে রাখার জন্যই হোক, আর অন্য যে কারণেই হোক, নিজস্বতা হারিয়ে নিজের বয়স ধরে রাখার চ্যালেঞ্জটা যেন আরও বেশি। মহানায়িকা সুচিত্রা সেন তো একটা বয়সের পর আর কারও সামনেই এলেন না! চিরসবুজ আর চিরতরুণ হয়েই তিনি সবার মনে থাকতে চাইলেন। বয়স নিয়ে এতটাই হীনম্মন্যতা!
মেয়েদের যে বয়স জিজ্ঞেস করতে হয় না, তাই নিয়ে কত কৌতুক আর ট্রলের ছড়াছড়ি! অথচ বয়স একটা সংখ্যামাত্র। নারীর বয়স বাড়লে সমস্যা কোথায়? মানুষের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় যেন, নারীর বয়স কাল্পনিক হুরদের মতো চিরকাল সুইট সিক্সটিনে আটকে রাখতে হবে। বয়সের ডিজিটে প্রথম অঙ্ক ৪-এ পৌঁছলেই যেন সে বাতিল মাল। বুড়ি! আবার চিরযৌবনবতী হলেও সমস্যা। জয়া আহসানের বয়স ৫০ ছুঁইছুঁই, কিন্তু তবু কেন সে এত সবুজ! এও কিন্তু নারীর এক বিরাট অপরাধ! আহা, নারী, তুমি কুড়িতেই কেন বুড়ি হও না? নারীর বয়স ১৬ হলে কী সুবিধা, আর ৪০ পেরিয়ে গেলেই বা সমস্যাটা কোথায়! অথচ প্রত্যেকটা বয়সের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। কেন আমরা তা ভুলে যাই?
নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার ব্যক্তিত্ব। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আত্মবিশ্বাস, দায়িত্বশীলতা, কোমলতা, দৃঢ়তা ইত্যাদি সবকিছু মিলেই নারীর ব্যক্তিত্ব অন্য স্তরের এক সৌন্দর্যের দিকে নিয়ে যায়। এ এমন এক সৌন্দর্য, তখন বয়স নিয়ে অহেতুক মাথা ঘামাতে হয় না। বয়স বৃদ্ধিকে জীবনের এক স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই নারী মেনে নিতে পারে।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.