সত্য সমাচার ডেস্ক:
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইদানীংকালের নাটক যেন গান ছাড়া অসম্পূর্ণ। এর কারণ মূলত দুটি। এক. দৃশ্যকল্পের সঙ্গে গানের আবেদন তৈরি এবং বাণিজ্যিকভাবে আলাদা একটা কন্টেন্ট বৃদ্ধি। তাই এখন প্রযোজক, পরিচালকরা নাটক নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে একটা গান নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আগেভাগেই বোঝেন।
সে সব নিয়েই লিখেছেন ইকবাল খন্দকার
একটা সময় ছিল, যখন নতুন নতুন গানের চিত্রায়ণ হতো কেবল চলচ্চিত্রের জন্য। সেসব গান জনপ্রিয় হতো, মুখে মুখে ফিরত। অবশ্য গান তৈরি, ব্যবহার কিংবা প্রচারের মাধ্যম আরও ছিল। বিশেষ করে রেডিও এবং ক্যাসেট। তবে দৃশ্য অনুযায়ী গান চিত্রায়ণের যে বিষয়টি, সেটি সম্পৃক্ত ছিল কেবলই চলচ্চিত্রের সঙ্গে। অন্তত গত শতাব্দী পর্যন্ত। এরপর পরিবর্তনের হাওয়া লাগে গানের পালে। সংগীতপ্রেমীরা গান শোনার চেয়ে দেখার প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। আর এরই সুবাদে তৈরি হতে থাকে দৃষ্টিনন্দন সব ভিডিও। এতে প্রসারিত হতে থাকে মিউজিক ভিডিওর বাজার। তবে তখনও নাটকে ব্যবহার হয়ে আসছিল জনপ্রিয় গানগুলোই। যেমন বিটিভিতে প্রচারিত বিভিন্ন নাটকে দেখা যেত, সেই সময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের গানগুলোই ব্যবহৃত হচ্ছে। এক্ষেত্রে যাদের গান বেশি ব্যবহার করা হতো, তাদের মধ্যে অন্যতম কুমার বিশ^জিৎ, রবি চৌধুরী, আঁখি আলমগীর, এসডি রুবেল প্রমুখ। তখন রবি চৌধুরীর গাওয়া ‘বেদনার সবটুকু আমাকে দিয়ে সুখ নিয়ে তুমি ফিরে যাও’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছে একাধিক নাটকে। যদিও এটি তার ক্যাসেটের গান। তখন আরেকটি গান দর্শক-শ্রোতার নজর কাড়ে। কুমার বিশ^জিতের গাওয়া- ‘যে শিকারী দেখে দেখে না’। এটি ছিল ধারাবাহিক নাটকের সূচনা সংগীত। তবে নাটকের দৃশ্য অনুযায়ী গানের ব্যবহার কিংবা দৃশ্য অনুযায়ী গান তৈরি- তখন পর্যন্ত সেভাবে ভাবতে শুরু করেননি নির্মাতা এবং সংগীত-সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু এই ভাবনা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে সময় লাগেনি খুব একটা। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে গত প্রায় এক দশক ধরে। এখন বড় বাজেটের কোনো নাটক মানেই এক বা একাধিক নতুন গান। এসব গানের কোনো কোনোটিতে অভিনয়শিল্পীরা চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের মতোই ঠোঁট মেলান, কোনো কোনোটি বাজানো হয় ব্যাকগ্রাউন্ড সংগীত হিসেবে। নাটকের জন্য আলাদা করে গান তৈরির এই বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ‘ভিউ’ তথা দর্শকপ্রিয়তার কারণে। বলা বাহুল্য, নাটকের এক একটি গান মুক্তির পর অনায়াসেই নজর কাড়ছে কোটি দর্শকের। এতে আগ্রহ পাচ্ছেন নাটক এবং সংগীত-সংশ্লিষ্টরা। ফলে তৈরি হচ্ছে আরও নতুন নতুন গান। যেগুলো সত্যিকার অর্থেই শ্রুতিমধুর এবং দৃষ্টিনন্দন। তবে খণ্ডনাটক বা একঘণ্টা ব্যপ্তির নাটকের চেয়ে গানের ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায় দীর্ঘ নাটকগুলোতে। বিশেষ করে টেলিফিল্মে। সেই গানটির কথা দর্শক এখনও মনে রেখেছেন- ‘কিছু কিছু নাম্বার থেকে আসবে না কোনো ফোন’। এটি ‘আমাদের গল্প’ নামের একটি টেলিফিল্মের জন্য তৈরি করা গান। গানটি দর্শককে কাঁদিয়েছিল, টেলিফিল্মের গল্পের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করেছিল। যে কারণে কারও মৃত্যুতে এখনও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে গানটি। এরপর সময় যত গড়িয়েছে, ততই প্রাসঙ্গিকতা বেড়েছে নাটকের গানের। আর সেসব গানের প্রতি দর্শক-শ্রোতার যে আগ্রহ, তা চোখে পড়ার মতো। কিছুদিন আগে প্রচারে আসে ‘হাউ সুইট’ নাটকটি। এই নাটকের বালাম ও ন্যান্সির গাওয়া ‘মায়া মায়া লাগে’ গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। আর নাটকটিকেও দেয় বিশেষ পরিচিতি। নাটকের গান এখন নির্মাতা এবং সংগীত-সংশ্লিষ্টদের দিয়েছে বাড়তি কাজের সুযোগ। এখন যারা এই অঙ্গনে ব্যস্ততার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন এবং নতুন নতুন গান উপহার দিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইমরান মাহমুদুল, জাহিদ নীরব, আভরাল শাহির, সোমনুর মনির কোনাল এবং দোলা রহমানের নাম। দর্শক-শ্রোতাদের বিশ^াস, তাদের হাত ধরে আরও মানসম্পন্ন গান বাজারে আসবে। আর সমৃদ্ধ হবে আমাদের সংগীত এবং নাট্যাঙ্গন।
কোনাল, সংগীতশিল্পী
নাটকের গান জনপ্রিয় হওয়ার কথা যদি বলি, তাহলে ‘বন্ধন’ নাটকের নাম বলতে হবে। এর আগে কোনো নাটকের গান এতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল কিনা, আমার ঠিক মনে পড়ে না। তবে এখন অনেক নাটকের অনেক গানই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আর আমি এই সময়টায়ই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছিÑ এটা আমার জন্য অনেক বেশি সৌভাগ্যের। এখন তো চলচ্চিত্র অনেক কমে গেছে; কিন্তু নাটক বেড়েছে। আর ডিজিটাল প্লাটফর্মে নাটক আসার পর থেকে গানের সংখ্যাও বেড়েছে। আমার কাজের কথা যদি বলিÑ এই সময়ে যারা নাটকে নিয়মিত, তাদের প্রায় সবার জন্যই আমি গেয়েছি; গাইছি। সত্যি কথা বলতে কি, নাটকের গান গাইতে আমার খুবই ভালো লাগে। আর যে সাড়াটা পাওয়া যায়, সেটা তো আরও ভালো লাগার।
জাহিদ নীরব, সুরকার ও সংগীত পরিচালক
আমার মতে, আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি এখন সবচেয়ে ভালো সময় পার করছে। আর এর মূলে রয়েছে নাটকের গান। খেয়াল করবেন, এখন অনেক সিনেমার গানও সেভাবে আলোচনায় আসে না বা শ্রোতাপ্রিয়তা পায় না। কিন্তু নাটকের অনেক গানই আলোচনায় চলে আসছে। আর আগেকার দিনে সিনেমার গান দিয়ে শুধু একটা পক্ষ লাভবান হতো। আর এখন নাটকের জন্য যেসব গান তৈরি হচ্ছে, সেগুলো দিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই লাভবান হচ্ছেন। শুধু নাটকের গান গেয়েই আলোচনায় আসা কেউ কেউ এখন বলিউড পর্যন্ত মাতাচ্ছে। এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।
দোলা রহমান, সংগীতশিল্পী
এখন ভিন্ন ভিন্ন কনসেপ্ট নিয়ে নাটক হচ্ছে। আর সেসব কনসেপ্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গান তৈরি হচ্ছে। এ গানগুলো গতানুগতিক গানের চেয়ে ভিন্ন। যে কারণে দর্শক-শ্রোতারা পছন্দ করছেন। আর আমরাও কাজ করে আনন্দ পাচ্ছি। তো নাটকে যে গানের ব্যবহার কিংবা নাটকের জন্য যে নতুন নতুন গান তৈরি করা, এ প্রক্রিয়াটা সংগীত-সংশ্লিষ্টদের জন্য খুব ভালো একটা কাজের ক্ষেত্র তৈরি করছে। আমাদের উচিত এটা ধরে রাখা। আর ভালো কিছু ধরে রাখা তখনই সম্ভব হয়, যখন সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সবচেয়ে ভালোটা দিয়ে যায়।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.