আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৯ আগস্ট ২০২৬
নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট নতুন একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ায় বন্যাকবলিত এলাকায় ফের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে স্থানীয় বাসিন্দারা নদী ও নিচু এলাকা ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। পরিস্থিতির কারণে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযানও স্থগিত রাখা হয়।
বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় নেপালে ৪৮৯ জন এবং চীনের তিব্বতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুই দেশ মিলিয়ে এখনো এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
হিমবাহ ধসের পর বিশাল শিলাখণ্ড, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত পাহাড়ি নদীগুলো দিয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি একটি নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়। ক্রমাগত পানি জমতে থাকায় হ্রদটির পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে বাড়তে থাকে।
নেপালের কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার হ্রদের পানি ভোটেকোশি নদীতে উপচে পড়ার আগে এতে পানির পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটারের বেশি হয়েছিল। আগের দিন পানির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার।
রসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পরিয়ার বলেন, হ্রদের তীর ভেঙে পানি প্রবাহিত হওয়ার বিষয়ে তাঁরা একটি সতর্কবার্তা পেয়েছেন। তবে হ্রদটির আকার এবং পানির উচ্চতা সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত নন। নদীতে পানির স্তর বাড়তে দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
পানি বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মাইকিং করে মানুষকে নদী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আতঙ্কিত লোকজন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে দ্রুত উঁচু এলাকায় চলে যেতে শুরু করেন। উদ্ধারকর্মীরাও তাঁদের সরঞ্জাম নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান।
নেপালের সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৯০ মিনিট উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে অভিযান আবার শুরু করা হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় তিব্বতের গিরোং এলাকায় উদ্ধারকারী দল ও যানবাহনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে উজানের নদীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে হওয়ায় উদ্ধার অভিযান পুনরায় শুরু হয়।
বুধবারের বন্যায় নেপালের বিভিন্ন গ্রাম ও উপত্যকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ভারতের তীর্থযাত্রী, যারা তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন।
এদিকে উদ্ধার অভিযান নিয়ে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে শুক্রবার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি হিমবাহের হ্রদ, ভূমিধসের ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নেপালে উদ্ধারকারী দলগুলো হেলিকপ্টারে করে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এলাকায় আকাশপথে ত্রাণও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে প্রশিক্ষিত কুকুরও ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে নেপাল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই বর্তমানে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই।
ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ নেপালকে উদ্ধারকারী দল দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে।
চীনের তিব্বতের গিরোং কাউন্টিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং দুর্যোগকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করেছেন।
বন্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন। তিনি নেপালকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, এত শক্তিশালী ভবনও এমনভাবে ধ্বংস হয়েছে, যেন সেগুলো দাঁত খোঁচানোর কাঠির মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.