প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ১, ২০২৬, ৪:৪৮ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ৩১, ২০২৬, ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ

মাস্কাট/ওয়াশিংটন:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক মাসব্যাপী সংঘাত থামাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আজ বড় ধরনের অচলাবস্থায় পড়েছে। ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাকে “অবাস্তব ও অযৌক্তিক” বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
ফেব্রুয়ারি ২৮-এ সংঘাত শুরু হওয়ার ঠিক এক মাস পর এই অবস্থান স্পষ্ট হলো। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভেতরে ১১ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে হোয়াইট হাউস দাবি করছে, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় “গঠনমূলক” পরোক্ষ আলোচনা এখনো চলছে। যদিও ইরান সরকার প্রকাশ্যে কোনো ধরনের সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
⸻
প্রস্তাব বনাম পাল্টা প্রস্তাব: অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরের শর্ত ছিল।
এর বিপরীতে তেহরান ৫ দফা পাল্টা দাবি তুলে ধরে, যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের “হত্যাকাণ্ডমূলক কার্যক্রম” সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন,
“টমাহক মিসাইলের ছায়ায় আমরা কোনো আলোচনা করবো না।”
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে—সমঝোতা না হলে ইরানের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়তে পারে।
⸻
বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ: জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের ফলে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
•যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারে পৌঁছেছে
•বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি দামে ব্যাপক অস্থিরতা
•ওয়াশিংটন প্রশাসন বলছে, এই সংঘাত “মাস নয়, সপ্তাহের মধ্যেই” শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে
⸻
মধ্যস্থতার ক্ষীণ আশার আলো
এ অবস্থায় একটি সীমিত ইতিবাচক অগ্রগতি এসেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি “বিশ্বাস-গঠনমূলক” উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইরান সম্মত হয়েছে ২০টি পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সীমিত হারে চলাচলের অনুমতি দিতে—প্রতিদিন দুইটি করে।
তবে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় ইয়েমেন, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরান-সমর্থিত হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে।
⸻
বিশ্বে অস্থিরতা: হরমুজ অবরোধে তেলের দাম ঊর্ধ্বগতি, সংঘাত রূপ নিচ্ছে বৈশ্বিক সংকটে
ওয়াশিংটন/তেহরান:
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করতেই বৈশ্বিক অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম আকাশচুম্বী, আর সামরিক হামলায় ধ্বংস হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
⸻
অর্থনৈতিক ধাক্কা: ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, এটি ইতিহাসের “সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয়”।
•ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলারে পৌঁছেছে (৫০% বৃদ্ধি)
•দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে বৈশ্বিক জিডিপি থেকে ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার হারানোর আশঙ্কা
•মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে ২.৫ শতাংশ পয়েন্ট
⸻
সার সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে
কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চল উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করায় বিশ্বে ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়ার এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
•সার দামে ৩৫–৫০% বৃদ্ধি
•বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে
⸻
সামরিক উত্তেজনা: অবকাঠামো ধ্বংস ও পাল্টা হুমকি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে বিমান হামলা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
•ইরানের কান্দাব ও আরাক পারমাণবিক স্থাপনা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত
•তেহরানে প্রায় সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বিভ্রাট
•প্রথমবারের মতো ‘Precision Strike Missile (PrSM)’ ব্যবহারের খবর
•কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বেসামরিক এলাকাতেও আঘাত হেনেছে বলে অভিযোগ
ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বাসভবনও “বৈধ লক্ষ্যবস্তু” হতে পারে।
⸻
কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সীমিত অগ্রগতি হলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি অচল। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান এবং তেলক্ষেত্র দখলের হুমকি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
⸻
শেষ কথা
বর্তমানে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এক বিপজ্জনক শক্তির দ্বন্দ্ব, যার দ্রুত সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
—————-
SYED L. ALI BAHRAM
FREELANCE JOURNALIST
Former member: Bangladesh Civil Service.