সত্য সমাচার ডেক্স :
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫,
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ কার্যত রাজনৈতিক অঙ্গনে অনুপস্থিতি। এ ছাড়া দলের নিবন্ধন স্থগিত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং মাঠের রাজনীতিতেও তাদের দেখা নেই। এই শূন্যতায় বিএনপি হয়ে উঠেছে মূল কেন্দ্রবিন্দু। তবে সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের পুরনো মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আগামী নির্বাচনে জোট গঠনকে কেন্দ্র করে চলছে গোপন বৈঠক, সমঝোতার আলাপ-আলোচনা। যদিও নির্বাচনের আগে জোটের সমীকরণ নতুন কিছু নয়, তবে এবারের প্রেক্ষাপট আলাদা। আওয়ামী লীগের বাইরে এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বিভিন্ন বামপন্থি ও ইসলামি দলের মধ্যে। ছোট দলগুলোও মরিয়া নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে। মাঠের রাজনীতিতে আন্দোলনের ডাক থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো আসন্ন নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। কোথায় আসন সমঝোতা হবে, কারা কাদের সঙ্গে হাত মেলাবে- এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
বিএনপি এখন সমমনা, বামপন্থি ও ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় ব্যস্ত। তাদের মতে, জামায়াত ছাড়া প্রায় সব দলের সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব। নাগরিক ঐক্য, এলডিপি, জেএসডি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, গণফোরামসহ এক ডজনের বেশি দল বিএনপির সম্ভাব্য মিত্র। ইসলামি দলগুলোর মধ্য থেকেও জামায়াত ছাড়া অন্যরা বিএনপির কাছে এগিয়ে আসছে। হেফাজতে ইসলামীসহ কিছু অরাজনৈতিক সংগঠনও বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। অন্যদিকে জামায়াত চেষ্টা করছে ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করতে। তবে মতাদর্শগত পার্থক্য ও আস্থা ঘাটতির কারণে অন্য ইসলামি দল জামায়াতের সঙ্গে একমত হতে পারছে না। হেফাজতে ইসলামীতে সক্রিয় কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাঁরা কখনও জোট করবেন না। ফলে জামায়াতের জোট গঠনের প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে মতাদর্শগত পার্থক্য, প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতির দাবিতে দলটির অবস্থান দৃঢ় হওয়ায় অন্যান্য সমমনা ও ইসলামী দলগুলো জামায়াত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনী জোটে জামায়াতের প্রচেষ্টায় তেমন সাড়া মিলছে না। এরপরও জামায়াত বিভিন্ন দলকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত রয়েছে। জামায়াতসহ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাগপা অভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার আগে বা পরে তারা কোন দলকে সঙ্গে নিয়ে জোট করবে, তা স্পষ্ট হবে। এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ইসলামপন্থি দলগুলো যাতে এক জায়গায় থাকতে পারে সেই চেষ্টা চলছে। আলাপ-আলোচনা চলমান।
বিএনপিও এবার ডান-বাম ও ইসলামি দলগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দলের লক্ষ্য হলো লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণফোরাম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় জোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ১১টি দল, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি। এ ছাড়া জামায়াত ছাড়া অন্য ইসলামি দলও বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। হেফাজতে ইসলামীসহ কিছু অরাজনৈতিক সংগঠনও বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখছে।
এদিকে এনসিপিও ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা উদারপন্থি কিছু দল নিয়ে নতুন জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। একইভাবে বামপন্থি দলগুলোও নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়তে চাইছে। গণতন্ত্র মঞ্চ, এনসিপি ও আরও কয়েকটি দল এরই মধ্যে বৈঠক করেছে। সম্প্রতি রাজধানীর হাতিরপুলের একটি রেস্তোরাঁয় ৯টি দলের বৈঠকে নতুন জোটের আলোচনা হয়েছে। বৈঠক বেলা সাড়ে ১১টা থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠিত হয়। এতে গণতন্ত্র মঞ্চের ছয় দল- নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও ভাসানী জনশক্তি পার্টি অংশ নেন। মঞ্চের বাইরে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে অন্তত তিন থেকে চারটি জোট গঠনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে কোনোটিই এখনও চূড়ান্ত নয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে জোট বা আসন সমঝোতার ঘোষণা আসবে। যদিও প্রক্রিয়াটি প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, তবে সব ইস্যুতে ঐকমত্য হলে শিগগিরই তা প্রকাশ করা হবে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে কোনো দল এককভাবে অংশ নিতে চায় না। বরং জোট বা আসন ভাগাভাগির মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রবণতাই প্রবল।
নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমীকরণে সবচেয়ে বড় ফারাক দেখা দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থানে। জামায়াত পিআর পদ্ধতির জন্য রাজপথে নেমেছে, যার কারণে তাদের অবস্থান ক্রমেই একঘরে হয়ে যাচ্ছে। বিএনপি প্রকাশ্যে এই পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে। শুধু বিএনপিই নয়, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), নাগরিক ঐক্য, কয়েকটি বাম দল এবং আরও অনেকে এই পদ্ধতিকে অগ্রহণযোগ্য মনে করছে। তাদের মতে, পিআর পদ্ধতি ভোটের স্বচ্ছ প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করবে এবং জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটাবে না।
অন্যদিকে জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদ দাবি তুলেছে- জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের অভিযোগ, জাতীয় পার্টি অতীতে আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। এ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, এমনকি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিএনপি স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিপক্ষে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত বলে বিএনপি মনে করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আলোচনার মধ্যেই রাস্তায় নামলে সেটা স্ববিরোধিতা হবে। আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাই। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যোগ করেন- জুলাই সনদ কার্যকর করার বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই ৯টি দল একত্রে আসতে পারে কি না, তা দেখছি। পাশাপাশি বিএনপি এবং বাম দলসহ ইসলামি ঘরানার দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালানো হবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জামায়াতের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে এনসিপি নেই। কারণ, জামায়াত নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতি চায়। আমরা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ ছাড়া এ মুহূর্তে কোনো জোট গড়ারও ইচ্ছা নেই আমাদের। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এগোবে এনসিপি।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.