সত্য সমাচার ডেস্ক:
১১ অক্টোবর ২০২৬
গ্লুকোমা চোখের এমন এক মারাত্মক ও জটিল অবস্থা, যেখানে চোখের স্বাভাবিক চাপ বা ইন্ট্রা অকুলার প্রেশার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে রেটিনাল নার্ভ ফাইবার বা দৃষ্টিভুগ স্নায়ুকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পরিশেষে অপরিবর্তনযোগ্য অন্ধত্ব ডেকে আনে। মানবদেহের রক্তচাপের মতোই চোখেরও একটি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, সাধারণত বংশগত জিনের ত্রুটি বা পারিবারিক প্রভাবই গ্লুকোমার মতো এই নীরব চোখের রোগের মূল কারণ হিসেবে কাজ করে থাকে।
রোগটির প্রত্যক্ষ কোনো একক কারণ সচরাচর চিহ্নিত না করা গেলেও কিছু নির্দিষ্ট ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ বা বিদ্যমান ঝুঁকির কারণে এর প্রাদুর্ভাব বহুলাংশে বেড়ে যায়। যেমনÑ চল্লিশোর্ধ্ব বয়স, বংশগত ইতিহাস, নির্দিষ্ট গোত্র বা বর্ণ, ডায়াবেটিস, মায়োপিয়া বা দূরদৃষ্টির মতো কিছু মেডিক্যাল কন্ডিশন, দীর্ঘসময় স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহার কিংবা নিয়মিত জন্মনিরোধক বড়ি সেবন। গ্লুকোমার সঙ্গে জড়িত এ ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো সচেতনভাবে পরিহার করে চললে রোগটির আক্রমণ থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকা সম্ভব। চোখের নিজস্ব কাঠামোগত গঠনের ওপর ভিত্তি করে গ্লুকোমাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকেÑ ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা এবং ন্যারো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা। এর মধ্যে ওপেন অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এর প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। রোগী বড়জোর সামান্য চোখ জ্বালাপোড়া বা পানি পড়ার মতো সাধারণ সমস্যা অনুভব করেন, যা সাধারণত কেউ গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগটি নীরবে বাড়তে থাকে এবং শেষ ধাপে এসে স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অন্যদিকে, ন্যারো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমার ক্ষেত্রে বেশ কিছু তীব্র উপসর্গ আকস্মিকভাবে দেখা দেয়। যেমনÑ চোখে প্রচণ্ড ব্যথা, হঠাৎ দৃষ্টিতে কুয়াশা বা রংধনু দেখা, চোখ লাল হওয়া, অতিরিক্ত পানি ঝরা, মাথাব্যথা এবং অনেক সময় বমি ভাব বা বমি হওয়া।
এ ন্যারো অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমার আক্রমণ সবসময় সক্রিয় থাকে না, বরং নির্দিষ্ট কিছু পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ চোখের চাপ বৃদ্ধি পায়। অন্ধকার ঘরে দীর্ঘক্ষণ টিভি দেখা, উপুড় হয়ে শুয়ে পড়া বা স্ক্রিনে কাজ করা, মানসিক চাপ, আই ড্রপের মাধ্যমে চোখের পাতা বড় করা এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন এই আক্রমণকে ত্বরান্বিত করে। বারবার এমন আকস্মিক অ্যাটাক বা আক্রমণ হলে চোখের উচ্চচাপ স্থায়ী রূপ লাভ করে। গ্লুকোমা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে মূলত দুটি প্রধান নিয়ামক পরীক্ষা করা হয়Ñ চোখের অভ্যন্তরীণ প্রেসার পরিমাপ এবং রেটিনার স্নায়ুর শারীরিক অবস্থা যাচাই করা।
সাধারণত ২১ মিমি অব মার্কারিকে চোখের চাপের স্বাভাবিক মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও কেবল চাপের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে গ্লুকোমা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই রেটিনার স্নায়ুর ক্ষতির সঠিক পরিমাণ মাপতে প্রত্যক্ষ পদ্ধতি হিসেবে ‘ওসিটি’ এবং অপ্রত্যক্ষ বা ইনডাইরেক্ট পদ্ধতি হিসেবে ‘ভিজ্যুয়েল ফিল্ড অ্যানালাইসিস’ পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। চোখের অতিরিক্ত চাপ এবং স্নায়ুর ক্ষতির সচিত্র প্রমাণ যৌথভাবে গ্লুকোমা নিশ্চিত করে। ন্যারো অ্যাঙ্গেলের রোগীদের ক্ষেত্রে কেবল অ্যাঙ্গেলটি সংকীর্ণÑ এই তথ্যটুকুই আগাম সাবধানতার জন্য যথেষ্ট। চোখের সুরক্ষায় গ্লুকোমা নিয়ে অবহেলা নয়।

