
‘আশা করেও আশার দেখা না পাওয়া’—প্রচলিত এই কথাটির অর্থ হলো, কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম কিংবা ভালো ফল পাওয়ার যৌক্তিক কারণ, সুযোগ বা প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও কোনো কিছুর জন্য প্রবলভাবে আশাবাদী থাকা।
আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত সাদা বলের সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এই কথাটির বেশ মিল রয়েছে। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে সেই আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
বিসিবির কর্মকর্তারা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন যে আগামী দিনগুলোতে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তবে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের কয়েকজন সদস্যকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আর সেই দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
৮ আগস্ট বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইতে পারে না, যদি তারা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি থেকে এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয়, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।
ভারত থেকে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই তার এই মন্তব্য আসে। বিসিবির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর মতে, ভারত থেকে শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলনই সেপ্টেম্বরে ভারতকে আতিথ্য দেওয়ার সম্ভাবনার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।
এটি বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও তারা দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের বরফ গলানোর ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিল বিসিবি।
বিশ্বকাপ বর্জনের কারণ হিসেবে নিরাপত্তাজনিত বিষয় সামনে আনা হয়েছিল। তবে ওই সময়ের পরিস্থিতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা কর্মকর্তারা ক্রিকেটবিষয়ক সূত্রকে জানিয়েছিলেন, বাস্তবে ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের সরাসরি নির্দেশেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাদের ধারণা, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে অন্য যেকোনো কারণের চেয়ে রাজনৈতিক বিরোধই বেশি প্রভাব ফেলেছিল।
ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করলে দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক বদলে যাওয়ার নতুন আশার সৃষ্টি হয়।
তখন পরিস্থিতিও সেই দিকেই এগোচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ভারতকে আতিথ্য দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ভারতীয় দলকে আতিথ্য দেওয়া যে কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডের জন্যই স্বপ্নের বিষয়। কারণ বিশ্বজুড়ে ভারতের বিপুল জনপ্রিয়তা, বাণিজ্যিক মূল্য এবং তাদের ঘিরে থাকা ব্যাপক উন্মাদনা আয়োজক দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে আর্থিকভাবেও বড় সুবিধা এনে দেয়।
তবে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর পরিস্থিতি যেভাবে বদলে গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ যে বিষয়টিতে অসন্তুষ্ট, সেটি স্পষ্ট হয়েছে। এর সঙ্গে শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অসন্তোষ প্রকাশ করা মন্তব্যও যোগ হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, সেপ্টেম্বরে ভারতকে আতিথ্য দেওয়া বাংলাদেশের জন্য এখন অসম্ভব না হলেও অনেক দূরের স্বপ্ন।
শনিবার পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিসিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তাও একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে ভারতকে আতিথ্য দেওয়ার বিষয়ে ক্রিকেটবিষয়ক সূত্রের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সব ঘটনার পর এখন আমি এই সিরিজ নিয়ে সন্দিহান।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিরিজের বিষয়ে অন্য পক্ষের কাছ থেকে আমরা কোনো সাড়া পাব বলে মনে হচ্ছে না। সত্যি বলতে, সিরিজটি ২৮ আগস্টের মধ্যে আয়োজনের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। এখন আমাদের হাতে আর কত দিন আছে?’
সিরিজটি পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার তা মনে হয় না। ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে বিষয়টি আমাদের সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’
তবে তিনি যোগ করেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজটি বাতিল ঘোষণা করা না হচ্ছে, ততক্ষণ আমাদের একমাত্র কাজ হলো আশা করে যাওয়া।’
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.