
বেশ কিছুকাল ধরে কোমলমতি শিশুদের ব্যবহার করে দেশব্যাপী নানামুখী কদর্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে এর প্রভাব জোরালোভাবে পরিলক্ষিত। সরকারের পতন ঘটলেও কতিপয় কিশোরের অপতৎপরতা যেন অপ্রতিরোধ্য। সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং, দোকান, ভূমিদখলসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে কথিত হিংস্র মানুষগুলো কিশোরদের দিয়েই সব ধরনের অপকর্ম সম্পন্ন করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোপন আতাতের মাধ্যমে এসব অপরাধ জনজীবনকে অতিষ্ট করার বিপুল জনশ্রুতি রয়েছে। নগর-শহর ও গ্রামীণ জনপদেও এদের ব্যবহার করে ভিন্ন মতের লোকদের দমন-পীড়ন-নির্যাতন-মামলা-হামলা-ধনসম্পদ দখলের দৃষ্টান্ত অপরিসীম। বয়সের কারণে এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও দুরূহ ব্যাপার ছিল। মাদক-অস্ত্রের ব্যবসা, এলাকায় সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করে নিরীহ জনগণকে ভয়ভীতি প্রদর্শনে তথাকথিত রাজনৈতিক টাউট-বাটপাররা এদের ব্যবহার করেছে অত্যন্ত জঘন্যভাবে।
প্রায় প্রতিটি অলিত-গলিতে সবার কাছে এরা পরিচিত এবং এদের ভয়ে সবাই ভীতসন্ত্রস্ত থাকত। সামান্য তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে বিবাদ-বিরোধ-মারামারি-হানাহানি এমনকি হত্যকাণ্ড পরিচালনা করতে এরা পিছপা হতো না। মানসিকভাবে এদের নানা উপায়ে এমন বিকলাঙ্গ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে এদের বিবেকবোধ কোনোভাবেই কার্যকর ছিল না। ক্রমান্বয়ে নেশাগ্রস্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং ভয়ংকর আচরণ প্রদর্শনেও দ্বিধাবোধ করত না। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যসূত্রে জানা যায়, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক সার্থক গণ-অভ্যুত্থানের পরও এদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ে গড়ে উঠেছে অপরাধের নতুন সাম্রাজ্য। ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত শুধু ঢাকার মোহাম্মদপুরেই খুন হয়েছে ১০ জন। এসব খুনের নেপথ্যে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও বাজার দখল ইত্যাদি। তা ছাড়া এই এলাকায় প্রকাশ্যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলি নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বা ডিবি পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোহাম্মদপুর এলাকার তিন রাস্তার মোড়, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাসনগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পার, চন্দ্রিমা হাউজিং, বসিলা হাক্কার পাড়, আদাবর, শ্যামলী হাউজিং, নবোদয় হাউজিং, তাজমহল রোড, নুরজাহান রোড, শ্যামলী রিং রোড, রায়েরবাজার, হুমায়ুন রোড ও বাবর রোডের আশপাশে জেনেভা ক্যাম্প এলাকা, টাউন হল ও আসাদ অ্যাভিনিউয়ের আশপাশ, আজম রোড, ইকবাল রোডে কিশোর গ্যাং জাতীয় অপরাধীদের তৎপরতা বেশি। ছোট-বড় মিলিয়ে এই এলাকায় আছে ৩০টি কিশোর গ্যাং। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ঠেলার নাম বাবাজি, ডায়মন্ড গ্রুপ, সালাম পার্টি, আসসালামু আলাইকুম পার্টি, দে ধাক্কা গ্রুপ, ব্রেকফাস্ট পার্টি, টক্কর ল, পাটালি গ্রুপ, লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল-চিনে ল, ল ঠেলা গ্রুপ, কোপাইয়া দে, ভাইপার, তুফান, টিকটক, ডিসকো বয়েজ, বিগ বস, নাইন স্টার, এসকে হৃদয় গ্রুপ, রনি গ্রুপ ও বিচ্ছু বাহিনী।
চলতি বছরের মে মাসে তৎকালীন সরকারের আমলে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিলকৃত বিশেষ প্রতিবেদন মতে দেশব্যাপী কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ২৩৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা শহরে ১২৭টি। এসব গ্যাংয়ের সদস্য ১ হাজার ৩৮২ জন। ঢাকার পর চট্টগ্রামে রয়েছে ৫৭টি। এসব দলের সঙ্গে জড়িত ছিল ৩১৬ জন। শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়; জেলা শহরগুলোতেও বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং-চক্র গড়ে ওঠে। যারা খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়েছে। নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ-মারামারিতে লিপ্ত হয়েছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বা একই পাড়া-মহল্লার বাসিন্দা অথবা বখে যাওয়া কিশোর-তরুণরা এক জোট হয়ে বাহারি-চটকদার নামে কিশোর গ্যাং তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে ওই নামে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আইডিও খোলা হয়। হিরোইজমের চিন্তাভাবনা থেকে কিশোরদের মধ্যে গ্যাং-কালচার শুরু হলেও তারা এখন ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক দলের বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ার ফলে কিশোররা নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে লিপ্ত হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরে ৫ থেকে ১৫ জন সদস্যের অন্তত ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয়। নগরজুড়ে এদের সদস্য সংখ্যা কমপক্ষে ১৪০০। জুলাই ২০২৩ থেকে চলতি বছরে এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানসহ ২০০ জনের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ। বর্তমানে বিচারাধীন ২ হাজার ২৩২টি মামলার বেশির ভাগ কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত। অতিসম্প্রতি চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনে-দুপুরেই ঘটছে ছিনতাই। নগরবাসী এর দায় দিচ্ছেন বিপথগামী পথশিশুদের। চট্টগ্রাম শহরের দুই নম্বর গেট, জিইসি, নিউমার্কেটসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক মোড়েই পথশিশুদের আনাগোনা দেখা যায়। এদের বেশিরভাগই নেশায় আচ্ছন্ন। নেশার খরচ জোগাড় করতে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ করছে তারা। পথচারী থেকে শুরু করে চলন্ত গাড়ির যাত্রীদের কাছ থেকেও তারা মোবাইল কিংবা দামি জিনিস ছিনিয়ে নিচ্ছে। আক্রমণের ভয়ে বাধাও দেয় না ভুক্তভোগীরা। কেউ বাধা দিলে ওরা ব্লেড বা ছুরি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ২০টি।
বিভিন্ন প্রতিবেদন, গবেষণার ফল ও জনশ্রুতি অনুসারে পারিবারিক-সামাজিক-ধর্মীয় অনুশাসনের অপচর্চা, অপরাজনীতির কদর্য প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা, অনৈতিক-অবৈধ পন্থায় বিভিন্ন দল-প্রতিষ্ঠানে নরপশুতুল্য অর্থ ও ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তিদের পদ-পদায়ন, সন্ত্রাসী-মাদকসেবী-দুর্নীতিগ্রস্ত দুর্বৃত্তদের কুৎসিত প্রভাবে কিশোর গ্যাং উপ-সংস্কৃতির প্রসারমাণতা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দরিদ্রতা-শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কর্মবঞ্চিত-নিপীড়িত-নিগৃহীত ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-সম্প্রদায়-বস্তিবাসীসহ নিম্ন-উচ্চবিত্তের সন্তানদের অনেকেই অবলীলায় এই উপ-সংস্কৃতির শিকারে পরিণত হচ্ছে। একদিকে রাতারাতি বা স্বল্প সময়ের মধ্যেই অনৈতিক প্রাচুর্যের উর্ধ্বগতি, অন্যদিকে প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তির ব্যাপক দূরত্বের সাংঘর্ষিক মিথস্ক্রিয়া এই অপসংস্কৃতিকে প্রগাঢ় গতিশীল করছে। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টিতে এসব অবুঝ, অনেকটা নির্বোধ শিশু-কিশোরদের ব্যবহারে ব্যতিব্যস্ত কথিত ‘বড় ভাই’ নামধারীরা কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অশুভ পৃষ্ঠপোষকতা অর্জনে সক্ষম বলে গুঞ্জন রয়েছে। এদের ধনসম্পদ ও বিত্ত-বৈভবের বেপরোয়া উড্ডীন প্রক্রিয়ায় কিশোরদের অসহায় অবলোকন ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ অধিকমাত্রায় নেতিবাচক উন্মত্ততায় আচ্ছাদিত।
বিশ্লেষকদের মতে, কথিত রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং-কালচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কিশোরদের একত্রিত করে কতিপয় নষ্ট চরিত্রের ঘৃণ্য ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের অপরাধে কিশোরদের সম্পৃক্ত করছে। কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে আছে স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধীচক্র ও কতিপয় স্বঘোষিত রাজনৈতিক নেতা। সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে কিশোরদের দিয়ে তারা অপরাধ করানোর সুযোগ নিচ্ছে। বিভিন্ন অপরাধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তারের পর আইনগত সহায়তাও দেয় আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এসব নেতারা। অনেক অশুভ শক্তি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কিশোর গ্যাং তৈরি করছে। পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত কিছু তথাকথিত রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়াই কিশোর গ্যাং-সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী। মাদক বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, দখল এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্তৃত্ব তৈরির জন্য এলাকার শিশু-কিশোরদের নিয়ে গ্যাং তৈরি করে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে ওই ধরনের নেতারা।
সময়ের আবর্তনে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণ প্রজন্মের ইতিবাচক ভূমিকা গভীরভাবে প্রত্যাশিত। বৈষম্যহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় তরুণদের কোনো বিকল্প নেই। আজকের কিশোর আগামী দিনে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে পরিপুষ্ট হয়ে দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত থাকবে। যথার্থ জ্ঞান-বিজ্ঞান-তথ্য-প্রযুক্তিতে পারদর্শী হয়ে মেধাবী তরুণদের কাতারে দাঁড়াতে না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ আলোকিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে। আপামর জনগণের ঐক্যবদ্ধতায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের সময়োপযোগী পদক্ষেপে কিশোর গ্যাং বিস্তার রুদ্ধ করা সময়ের জোরালো দাবি।
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.