স্টাফ রিপোর্টার: জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়া, পদোন্নতি আটকে থাকা, নিয়োগ ও নিয়মিতকরণে জটিলতা, একাধিক মামলা এবং প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধের কারণে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে এলজিইডির প্রশাসনিক কাঠামো জটিল হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে এলজিইডির উন্নয়নকাজে।
সর্বশেষ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ নিয়ে জটিলতা আরও বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম শ্রেণির প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত করা যায়নি। এ অবস্থায় একসঙ্গে ২২৫ জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলীকে ছয় মাসের জন্য জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোথাও পুরোনো নির্বাহী প্রকৌশলীকে সরিয়ে নতুন পদায়ন করা হচ্ছে। আবার নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ পাওয়ার পরও দায়িত্ব বুঝে না পেয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর পদেই কাজ করছেন কেউ কেউ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ছয় শতাধিক প্রকৌশলীর পদোন্নতি আটকে আছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিআরডি) ও অধিদপ্তরের প্রক্রিয়াগত গাফিলতি, বিধি অনুসরণে ঘাটতি থাকায় এই জটিলতা দিন দিন বাড়ছে।
জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত হয়নি
এলজিইডির সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। এর পর ১১ বছর ধরে নতুন তালিকা চূড়ান্ত করতে পারেনি স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিআরডি)। ২০১৫ ও ২০২৪ সালে দুই দফা খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হলেও এক পক্ষ আদালতে গেলে রায়ে তা বাতিল হয়।
গত এপ্রিলে আবার একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে চারটি গ্রুপ আপত্তি জানায়। এর পর গত চার মাসে ৯ দিন ব্যক্তিগত শুনানি হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৮ আগস্ট এলজিআরডির অতিরিক্ত সচিবের (উন্নয়ন) সভাপতিত্বে সচিবালয়ে সভা হয়। এলজিআরডি সূত্র জানিয়েছে, ওই সভায় তালিকা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এখনও তা প্রকাশ করা হয়নি। কমিটির দুই সদস্য তালিকাটি গোপন রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।
জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রণয়ন কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চলতি দায়িত্বে নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার পরও পাঁচ কর্মকর্তা এ দায়িত্বকে অবৈধ দাবি করে আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ হলেও তারা মামলা করতে পারেন। বর্তমান অবস্থায় বিধি মেনে তালিকা চূড়ান্ত করাও বেশ কঠিন বলে মত দেন এই কর্মকর্তা।
কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, তালিকা চূড়ান্ত করতে আরও কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে আদালতের রায় রয়েছে। সার্বিক পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, তালিকায় উল্লেখ থাকবে–যাদের চাকরি নিয়মিত হয়নি, তাদের নিয়মিত করতে হবে। এ নিয়ে আদালতে অনেক মামলা হয়েছে, রায়ও এসেছে। এখন একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। কেউ সংক্ষুব্ধ হলে প্রতিকার চাইতে পারবেন।
প্রকল্পের কর্মকর্তাদের চাকরি নিয়মিতকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এলজিইডি থেকে প্রস্তাব পাওয়া গেলে তাদের চাকরি নিয়মিতকরণ করা হবে।
ছয় শতাধিক প্রকৌশলীর পদোন্নতি আটকা
জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়ায় ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া ছয় শতাধিক প্রকৌশলীর পদোন্নতি আটকে আছে। এসব প্রকৌশলী বিসিএস নন-ক্যাডার ও পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের অনেকে দুই-তিন বছর আগে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা প্রকৌশলী মোবারক হোসেন বলেন, ‘দুই-তিন বছর আগে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়ার কথা। কিন্তু জ্যেষ্ঠতার তালিকা না থাকায় বঞ্চিত হচ্ছি আমরা।’
প্রকল্প থেকে রাজস্বে আসা প্রকৌশলীদের নিয়ে জটিলতা
প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতা নিয়েও দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে। ২০০৫ সালের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালার ৫(১) অনুযায়ী, নিয়মিতকরণের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা গণনার বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০১০ ও ২০১১ সালে নিয়োগ পাওয়া ২৪০ প্রকৌশলীকে ওই বিধিমালা অনুযায়ী পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়মিত করা হয়নি।
এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া প্রকৌশলীদের স্থায়ী পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়েও একাধিক মামলা হয়েছে। আদালতের আদেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের জ্যেষ্ঠতা বহাল রাখা এবং নিয়মিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু বিষয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, পিএসসির আওতাভুক্ত কোনো পদ কমিশনের সুপারিশ ছাড়া নিয়মিত করা হলে, তা বিধিবহির্ভূত হবে। এর পর পদোন্নতি দেওয়া হলেও সেটি বিধিবহির্ভূত কাজ হবে। তাঁর মতে, এখন পিএসসির সুপারিশ নিয়ে নিয়মিত করার সুযোগ আছে। আদালতের রায়ের পর পিএসসির মাধ্যমে নিয়মিত করা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘আগে পিএসসির মাধ্যমে কেন নিয়মিতকরণ হয়নি, তা আমি বলতে পারব না। এখন তাদের পিএসসির মাধ্যমে নিয়মিত করতে হবে, নাকি মার্জনা করা হবে– এ বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে।’
বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি, সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ নিয়ে টানাটানি
এলজিইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলীর স্থায়ী পদ আছে ১৬৮টি। এসব পদে প্রায় ২০০ কর্মকর্তা কর্মরত থাকলেও গত ২ এপ্রিল ও ১১ মে আলাদা আদেশে ২২৫ জনকে ছয় মাসের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। নতুন দায়িত্ব পাওয়া অনেক কর্মকর্তাকে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা শুধু হাজিরা খাতায় সই করছেন। এদের অনেকের বসার জায়গা নেই।
চলতি দায়িত্ব পাওয়ার পর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন পেতে অনেক কর্মকর্তা অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়ে ধর্ণা দিচ্ছেন। তিন থেকে চার মাসে প্রায় ৫০ জেলায় এসব কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে। আবার পদোন্নতি পাওয়ার দুই থেকে তিন বছর পর যারা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে যোগ দিয়েছেন তাদের অন্তত ২০ জনকে অল্প সময়ের মধ্যে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে অনেক জেলায় দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। গাইবান্ধায় গত জুলাইয়ের শেষ ১০ দিন একই কার্যালয়ে দুজন নির্বাহী প্রকৌশলী কাজ করেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সাইফুল ইসলাম। গত ১৫ জুলাই আব্দুল আজিজকে গাইবান্ধায় বদলি করা হয়। এর পর দুজনই নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে অফিস করেন। এতে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে আরও অন্তত ১০ জেলায়।
চলতি দায়িত্বের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ দায়িত্ব সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ ছয় মাস বহাল থাকবে। একে কোনোভাবেই পদোন্নতি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। চলতি দায়িত্ব পালনের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওই পদে বা অন্য কোনো পদে বদলি কিংবা পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগণ্যতা বা অধিকার অর্জন করবেন না।
ময়মনসিংহের জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হুমায়ুন কবীর জানান, তাঁকে আগে কিশোরগঞ্জে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছিল। সেখানে যোগ দিতে না পেরে ময়মনসিংহে যোগ দিয়েছেন। কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব না ছাড়ায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে।
গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ বলেন, আগে যিনি ছিলেন, তিনি থাকার চেষ্টা করতেই পারেন। পরে তিনি প্রশাসন শাখার নির্দেশে গাইবান্ধায় যোগ দিয়েছেন।
গাইবান্ধার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের ব্যাচের অনেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার পাঁচ বছর পর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়ন পেয়েছিলেন। অথচ দুই-তিন মাসের মধ্যেই তাদের বদলি করা হয়েছে। প্রায় ৩০ জন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বসার জন্য চেয়ার-টেবিলও নেই।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.