স্টাফ রিপোর্টার:
উচ্চতার ছাড়পত্র (হাইট ক্লিয়ারেন্স) প্রদান প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক সচেতন নাগরিক। অভিযোগে বেবিচকের সিনিয়র কার্টোগ্রাফার শফিকুল ইসলাম এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, উচ্চতার ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আবেদনকারীদের হয়রানি, ফাইল আটকে রাখা এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে দ্রুত অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন করলেও অনেক আবেদন মাসের পর মাস ঝুলে থাকে। তবে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কিছু আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়।
লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি প্রভাবশালী চক্র উচ্চতার ছাড়পত্র প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে সাধারণ আবেদনকারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত নথিপত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট ছাড়পত্রের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা-১৭ মৌজার কয়েকটি সংলগ্ন প্লটের জন্য ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতা অনুমোদনের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
বেবিচকের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট ফরহাদ হোসেন লিমিটেডের নামে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ জমির জন্য সর্বোচ্চ ৬৯ ফুট উচ্চতার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে একই এলাকার আরেকটি প্লটের জন্য ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মো. আসলামজাদা হোসেন চৌধুরী গ্রুপের অনুকূলে ১০৭ ফুট উচ্চতা অনুমোদন করা হয়। এরপর ২ মার্চ একই মৌজার আরেকটি প্লটের জন্য মো. আসাদুজ্জামানের নামে ৯২ ফুট উচ্চতার ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
একই এলাকার পাশাপাশি অবস্থিত প্লটগুলোর জন্য ৬৯, ৯২ ও ১০৭ ফুট—তিন ধরনের ভিন্ন উচ্চতা নির্ধারণ করায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও প্রতিটি অনুমোদনপত্রে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) Annex-14 এবং ANO-14 বিধিমালা অনুসরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে চলতি বছরের মার্চে ঢাকার উত্তরা আবাসিক এলাকার তিনটি পৃথক প্রকল্পের জন্যও ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতার ছাড়পত্র দিয়েছে বেবিচক। ১২ মার্চ জারি করা একটি অনুমোদনপত্রে মো. হানিফ আহমেদ গংয়ের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জমির জন্য সর্বোচ্চ ৭৮ ফুট উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে ৪ মার্চ ট্রপিক্যাল হোমস লিমিটেডের মাধ্যমে করা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৮০ দশমিক ৮৮ শতাংশ জমিতে নির্মাণাধীন একটি আবাসিক প্রকল্পের জন্য ১৯৫ ফুট উচ্চতার অনুমোদন দেওয়া হয়। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি আবেদনের ভিত্তিতে উত্তরা সেক্টর-১৫ এলাকায় সমপরিমাণ জমির জন্য ১২ মার্চ ২১৫ ফুট উচ্চতার ছাড়পত্রও দেওয়া হয়।
বেবিচকের অনুমোদনপত্রে বলা হয়েছে, নির্ধারিত উচ্চতার মধ্যে ভবনের ছাদ, সিঁড়িঘর, লিফট, অ্যান্টেনা, লাইটিং ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ক্রেনসহ সব স্থাপনা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে অনুমোদন বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ভবনের শীর্ষে সতর্কতামূলক লাল বাতি স্থাপনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিমানবন্দরের ফ্লাইট সেফটি জোনের আওতাভুক্ত এলাকায় ভবনের উচ্চতা নির্ধারণে সাধারণত নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। সে ক্ষেত্রে একই মৌজা বা সংলগ্ন প্লটগুলোর জন্য উচ্চতার বড় ধরনের পার্থক্য কেন দেখা যাচ্ছে, তা কারিগরি ও প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং উচ্চতা নির্ধারণের যৌক্তিকতা স্পষ্ট করতে স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।
অভিযোগকারীও বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.