ঢাকা১৩ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইসলামাবাদ বৈঠক : চুক্তি ছাড়াই ফিরে গেল দুই পক্ষ ইরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র

admin
এপ্রিল ১৩, ২০২৬ ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সত্য সমাচার ডিজিটাল:

১৩ এপ্রিল ২০২৬

ব্যর্থ। তবু, আশার আলো নেভেনি। সরল স্বীকারোক্তি সব পক্ষেরই। ইসলামাবাদ বৈঠক থেকে কোনো ফল ছাড়াই শূন্য ঝুড়ি নিয়ে ফিরে গেছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি দল। অনাস্থা ও অবিশ্বাসের যে যোজন যোজন ফাঁক, তা ঘোচাতে ব্যর্থ হয়েছে দুই পক্ষই। বিশেষ করে ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কিছুতেই আস্থা রাখতে পারছে না। এ কারণেই ‘দাম্ভিক’ ওয়াশিংটনের অযৌক্তিক দাবি মানেনি ‘অদম্য’ তেহরান। তবে পাকিস্তান আশাবাদী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে স্থায়ী শান্তি অর্জনে আরও আলাপে যুক্ত হবে। একতরফা আগ্রাসনের শিকার ইরান এরই মধ্যে বলেছে, তারা কূটনৈতিক দরজা খোলা রেখেছে। কিন্তু যুদ্ধবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফের স্বভাবসুলভ হুমকিধমকি শুরু করেছেন। বলেছেন, নৌ অবরোধ করা হবে ইরানকে, সময় মতো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে তাদের। ফলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ভণ্ডুল হয়ে আবার জোরদার যুদ্ধ বাঁধার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

২৮ ফেব্রুয়ারি বিনা উসকানিতে ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল ও এর পশ্চিমা মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। ৪০ দিনের মাথায় পৌনে চার হাজার মানুষ খুন হওয়ার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৪ দিনের জন্য ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। স্থায়ী শান্তির সন্ধানে শনিবার ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেছিল দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা। টানা ২১ ঘণ্টার বৈঠক সফল হয়নি।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসে রাজসিংহ চরিত্রকে যেমন দেখা যায়, ইরানের নেতৃত্বও তেমন। রাজসিংহ যেমন দিল্লির মসনদে বসা পরাক্রমশালী আওরঙ্গজেবের অযৌক্তিক ও দাম্ভিক শর্তের সামনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছিলেন, কোনোভাবেই মাথা নত করেননি; যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ঔদ্ধত্যের সামনে তেহরানের দৃঢ় অবস্থানও ছিল ঠিক তেমনই। পরাশক্তির রক্তচক্ষু বা ধ্বংসের হুমকির কাছে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায্য অধিকার বিকিয়ে দিতে রাজি হননি তারা।

গভীর অনিশ্চয়তায় শান্তির আশা : পাকিস্তানের কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে ঘেরা সেরেনা হোটেলে শনিবার বিকাল থেকে শুরু হয়ে রবিবার সকাল পর্যন্ত চলে এই ঐতিহাসিক রুদ্ধদ্বার আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মূল আলোচনার পাশাপাশি অর্থনীতি, সামরিক ও পরমাণুবিষয়ক কারিগরি কমিটিগুলোর মধ্যে লিখিত প্রস্তাব চালাচালিও হয়।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই বৈরী দেশের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠক আর কখনও হয়নি। কিন্তু নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখার মার্কিন মানসিকতা ও তেহরানের প্রতি তাদের অযৌক্তিক দাবির কারণে এই বৈঠক থেকে কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি। অতীতের চুক্তি ভঙ্গের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না ইরান; উল্টো তাদের আস্থা অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আশা আপাতত গভীর এক অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেল।

রবিবার সকালে ইসলামাবাদ ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের ভ্যান্স জানান, তারা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্তগুলো স্পষ্ট করেছিল, কিন্তু ইরানি প্রতিনিধি দল তা মেনে নেয়নি।

তবে আলোচনা ভেস্তে গেলেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছে উভয় পক্ষই। ভ্যান্স বলেন, ‘আলোচনায় যে ঘাটতিই থাকুক না কেন, তা পাকিস্তানিদের কারণে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির অবিশ্বাস্য আতিথেয়তা দেখিয়েছেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে একটি চুক্তির জন্য অসাধারণ কাজ করেছেন।’

দাম্ভিক ওয়াশিংটন, অনমনীয় তেহরান : পলিটিকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে তেহরান তাদের পারমাণবিক অধিকার ও আঞ্চলিক সুরক্ষার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি ছিল একেবারেই একতরফা। তারা চায়, ইরান শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকেই বিরত থাকবে না, বরং চিকিৎসাসহ অন্যান্য শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক সরঞ্জামও তাদের ধ্বংস করতে হবে। স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশের জন্য এমন শর্ত মেনে নেওয়া কার্যত আত্মসমর্পণের শামিল। স্পিকার গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিনিধি দলের আস্থা অর্জন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বৈঠকের পর তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে বলেন, ‘আমরা সদিচ্ছা নিয়েই কিছু দূরদর্শী উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিপক্ষের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই।’

ইরান মূলত অত্যন্ত যৌক্তিক কিছু দাবি তুলে ধরেছিল। এর মধ্যে রয়েছে : লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর, বিদেশে আটকে থাকা তাদের নিজস্ব ৭০০ কোটি ডলারের সম্পদ ছাড়, বিগত দিনের অন্যায় নিষেধাজ্ঞার অবসান ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই ন্যায্য দাবিগুলোকে ‘অতিরিক্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের পাশবিক হামলা বন্ধ করতে ওয়াশিংটনের কোনো দৃশ্যমান চাপ না থাকায় ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার সদিচ্ছা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

কূটনৈতিক দরজা খোলা রাখার আভাস : বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে ইরান খুব ভালো করেই জানে, ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি কতটা ভঙ্গুর। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার স্মৃতি তেহরানের কাছে এখনও জ্বলজ্বলে। তাই এবার আর ফাঁকা বুলিতে ভুলতে রাজি নয় তারা। তবে চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলেও ইরান অত্যন্ত পরিপক্বতার সঙ্গে কূটনীতির দরজা খোলা রেখেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ‘৪০ দিনের একটি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর মাত্র এক সেশনের আলোচনায় চুক্তি হয়ে যাবে, এমনটা কেউ আশা করেনি।’ তিনি জানান, দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে বোঝাপড়া তৈরি হলেও দুই-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য অনেক বেশি ছিল। বাঘাই আরও জানান, পাকিস্তান ও এই অঞ্চলে ইরানের অন্য মিত্রদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তেহরান আত্মবিশ্বাসী। ইরানের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, তারা সমস্যা সমাধানে আগ্রহী, তবে সেটি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও নিজেদের অধিকার সমুন্নত রাখার ভিত্তিতে; কারও আধিপত্য মেনে নিয়ে নয়।

ফের হুমকিধমকি শুরু ট্রাম্পের : আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার চেনা আগ্রাসী রূপে ফিরে গেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইসলামাবাদে আলোচনা ‘ভালো’ হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ইস্যুতেই ইরান ‘অনমনীয়’ ছিল।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এর পরপরই তিনি হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর উসকানিমূলক ঘোষণা দেন। ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তিনি আন্তর্জাতিক জলসীমায় সাধারণ জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়ার এই ঔদ্ধত্য দেখিয়ে উল্টো ইরানকেই দোষারোপ করেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বেসামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন।

তবে ইরানও এসব হুমকিতে ভীত নয়। ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবাই জোর দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি’ ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এই কৌশলগত জলপথ নিয়ে কোনো আপস হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, দেশের ওপর এত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের তেল রপ্তানি প্রতিদিন ১৬ লাখ ব্যারেল ছাড়িয়েছে। ইরানি জাতি তাদের দাবি থেকে এক ইঞ্চিও পিছু হটবে না।

যুদ্ধবিরতি বাড়বে, নাকি আবার যুদ্ধ বেঁধে যাবে : ইসলামাবাদের এই অসম্পূর্ণ অধ্যায়ের পর পুরো বিশ্ব এখন এক চরম উৎকণ্ঠায় প্রহর গুনছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় অর্জিত দুই সপ্তাহের যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলছে, তার মেয়াদ শেষ হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে? হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়। মার্কিন যুদ্ধজাহাজের আনাগোনা ও ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে এই প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। তেলের দাম ওঠানামা করছে, যা ইউরোপ ও আমেরিকায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে বিশ্ব অর্থনীতি চরম মন্দার মুখে পড়বে। অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো ইসরায়েল। লেবাননে তারা অনবরত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সদর্পে ঘোষণা করেছেন, ইরানের ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসন থামবে না।

এমন এক উত্তপ্ত ও বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার ও টেকসই শান্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু আস্থার যে বিশাল ফাটল দুই দেশের মধ্যে রয়েছে, তা জোড়া লাগানোর জন্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সুবাতাস বইবে, নাকি পরাশক্তির অহমিকায় আবারও ধ্বংসের দাবানল জ্বলে উঠবে, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের আগামী দিনগুলোর বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক আচরণের ওপর।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।