অনলাইন ডেস্ক
২৫ এপ্রিল ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও আড়ালে সমঝোতার পথ খুঁজে বের করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শুক্রবার রাতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সফর করতে পারে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতির ‘প্রবল সম্ভাবনা’ রয়েছে। এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে আরাগচির টেলিফোন আলাপে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ পুনরুজ্জীবনের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে পাকিস্তানে পাঠাচ্ছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আপাতত এই সফরে থাকছেন না। কারণ ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফও এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না।
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে গালিবাফকে ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান এবং ভ্যান্সের সমমর্যাদার প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কর্মকর্তারা আরও জানান, আলোচনার অগ্রগতি হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট যেকোনো সময় ইসলামাবাদ যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
ইসলামাবাদে এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘসময় ধরে আলোচনা হয়েছে, তবে তা ফলপ্রসূ হয়নি। এবার দ্বিতীয় দফার নতুন বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তা জোরদার, হোটেল বুকিং এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের আগমনÑ সব মিলিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে তেহরানের অনীহা এখনও বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে আরাগচির ওমান ও রাশিয়া সফরেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের ইঙ্গিত মিলছে, যা সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে আরও গতিশীল করতে পারে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অবস্থান কঠোর থাকলেও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানের সামনে একটি ‘ভালো ও কার্যকর চুক্তি’ করার সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ আরও কঠোর করার হুশিয়ারি দেন। তার ভাষায়, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ আরও কঠোর হচ্ছে, পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি তুলনামূলক নরম অবস্থান নিয়েছেন। তিনি পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘উপযুক্ত ও লাভজনক’ না হলে কোনো চুক্তি হবে না।
এদিকে সামরিক প্রস্তুতিও থেমে নেই। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ইরানের নৌ সক্ষমতা- বিশেষ করে দ্রুতগামী নৌযান, মাইন স্থাপনকারী জাহাজ এবং অন্যান্য কৌশলগত সম্পদ নিশানা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরানও পাল্টা হুশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাঈল সাকাব এসফাহানি বলেন, ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা হলে সমপরিমাণ জবাব দেওয়া হবে। তার ভাষায়, ‘চোখের বদলে চোখ নীতি অনুসরণ করা হবে।’ তিনি আরও দাবি করেন, আলোচনার টেবিলে ইরানের প্রতিনিধি দল শক্ত অবস্থান নিয়েছে এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে জনগণের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেইÑ সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ইরানি পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজকে চীনের উপহার হিসেবে দাবি করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
অন্যদিকে ওমান সাগর দিয়ে একটি ইরানি পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদে বন্দরে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ফারস নিউজ। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ-ইউনিটের নিরাপত্তায় জাহাজটি যাত্রা সম্পন্ন করে বলে দাবি করা হয়।
তেহরানে ‘শত্রু লক্ষ্যবস্তু’ শনাক্ত হওয়ার পর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হুমকি, অন্যদিকে কূটনৈতিক সংলাপের চেষ্টা- এই দুই বিপরীতপ্রবণতার মধ্যেই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠক সফল হলে তা চলমান সংকট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সম্পাদক:মো: আবু ফাত্তাহ
বেঙ্গল সেন্টার (৬ষ্ঠ তলা) ২৮ তোফখানা রোড ঢাকা-১০০০।
ফোন:০১৬১৮৫১১৫১৭ মেইল: sattyasamacher@gmail.com
Copyright © 2026 sattyasamacher.com. All rights reserved.